লাতিন আমেরিকার দেশ কিউবাকে ‘বন্ধুত্বপূর্ণভাবে দখল’ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে মেরিন ওয়ানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এমন মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই বক্তব্যে ওয়াশিংটন-হাভানা সম্পর্ক ঘিরে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘খুব উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা চলছে এবং শেষ পর্যন্ত এটি একটি বন্ধুত্বপূর্ণ রূপান্তরে গড়াতে পারে।’
ট্রাম্প দাবি করেন, কিউবার সরকার বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তাদের কাছে এখন অর্থ নেই, তেল নেই, খাদ্য নেই। তারা বড় সংকটে আছে এবং আমাদের সাহায্য চাচ্ছে।’ ট্রাম্প কিউবার এমন পরিস্থিতিকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ট্রাম্প আরও জানান, কিউবা সম্পর্কিত বিভিন্ন নীতি গ্রহণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। মার্কিন এ পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও কিউবান-আমেরিকান এবং হাভানার কমিউনিস্ট সরকারের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত।
গত কয়েক মাসে ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করতে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
গভীর রাতে ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’ পরিচালনা করে নিজ বাড়ি থেকে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে আনা হয়। তিনি এখন মাদকসংক্রান্ত মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বন্দিশালায় বিচারের অপেক্ষায় দিন পার করছেন। এই অভিযানে মাদুরোকে নিরাপত্তা দেওয়া অন্তত ৩০ জন কিউবান সেনাসদস্য নিহত হয়।
এরপর ১১ জানুয়ারি ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় আর তেল বা অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে না। ২৯ জানুয়ারি তিনি একটি নির্বাহী আদেশে কিউবায় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। কিউবার বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর হওয়ায় এ পদক্ষেপ দেশটির জ্বালানি সংকট আরও তীব্র করে তুলেছে।
জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কিউবায় মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল ট্রাম্পের এই অবরোধমূলক নীতিকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি ‘একতরফা অর্থনৈতিক জবরদস্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
২০২৫ সালের অভিষেক ভাষণে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও ‘বর্ধিষ্ণু জাতি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন। এরপর থেকে তিনি গাজা, ভেনেজুয়েলা, গ্রিনল্যান্ড, পানামা ও কানাডা নিয়ে প্রভাব বিস্তারের বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন। ১৯শ শতকের ‘মনরো নীতি’ ও ‘ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’র মতো সম্প্রসারণবাদী ধারণারও উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প।
সম্প্রতি স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প জানান, ভেনেজুয়েলার ৮০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বহিঃপ্রকাশ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে কিউবার অর্থনীতি ‘শ্বাসরোধ’ করতে চাইছে। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘কিউবা তার সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায় দৃঢ় ও সংকল্পবদ্ধ।’
সম্প্রতি কিউবার উপকূলে ফ্লোরিডা নিবন্ধিত একটি স্পিডবোটের সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। হাভানা একে ‘সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশের চেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কিউবায় মানবিক সংকট তীব্র হলে তা নতুন অভিবাসন ঢেউ সৃষ্টি করতে পারে, যা ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতির জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা
কেএম