পেঁয়াজরঙা শাড়ির ওপর সূক্ষ্ম সুতোয় আঁকা গল্প, নকশিকাঁথার সেই শৈল্পিক আবরণে নিজেকে মুড়ে হাজির হলেন বাঁধন। পোশাকটি কেবল একটি শাড়ি নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য আর আধুনিক রুচির এক নান্দনিক মেলবন্ধন।
এই শাড়িটির নকশা করেছেন দেশের খ্যাতিমান ফ্যাশন ডিজাইনার মাহিন খান। তার ডিজাইনে বরাবরই থাকে দেশীয় ঐতিহ্যের আধুনিক উপস্থাপন আর এই শাড়িতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পেঁয়াজরঙা জমিনের ওপর নকশিকাঁথার সূক্ষ্ম সেলাই যেন গল্প বলছে। গ্রামবাংলার আঙিনা, পাখি, ফুল, লতা আর স্মৃতির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা আবেগের গল্প।
নকশিকাঁথা মূলত গ্রামীণ নারীদের হাতে তৈরি এক ঐতিহ্যবাহী শিল্প। পুরোনো কাপড়ের ওপর সেলাই করে ফুটিয়ে তোলা হতো জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, আনন্দ-বেদনা আর স্বপ্ন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গৃহস্থালি শিল্পই এখন আন্তর্জাতিক ফ্যাশনমঞ্চে স্থান করে নিয়েছে। আর সেই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরার প্রয়াস দেখা গেল বাঁধনের এই লুকে।
বাঁধনের শাড়িটি কেবল ঐতিহ্য বহন করেনি, বরং একে আধুনিক রূপও দিয়েছে। শাড়ির সঙ্গে তিনি পরেছিলেন কনভার্টেবল স্টাইলের কলারযুক্ত খাটো জ্যাকেট। এই জ্যাকেটটি পুরো লুককে দিয়েছে একটি সমসাময়িক আবহ। ঐতিহ্যবাহী শাড়ির সঙ্গে এমন আধুনিক সংযোজন দেখিয়েছে ফ্যাশনের নতুন দিক, যেখানে শেকড় ও আধুনিকতা পাশাপাশি হাঁটে।
শাড়িটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে বাঁধন তার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘মাহিন খান আপু এই সুন্দর নকশিকাঁথার শাড়িটির জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আমাকে বিশ্বাস করে নকশিকাঁথাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি আপনার কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। এত সুন্দর ও অর্থবহভাবে আমাদের সংস্কৃতির একটি অংশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারা সত্যিই আমার জন্য বিশেষ সম্মানের।’
এই বক্তব্যেই স্পষ্ট বাঁধনের কাছে এটি ছিল কেবল একটি ফ্যাশন লুক নয়, বরং সাংস্কৃতিক দায়িত্বও। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশীয় ঐতিহ্য তুলে ধরার সুযোগ তিনি সম্মানের চোখে দেখেছেন।
পুরো লুকটিকে পরিপূর্ণ করেছে তার ছিমছাম খোঁপা। চুলের এই সহজ বাঁধন শাড়ির কারুকাজকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। অতিরিক্ত অলংকার বা ভারী মেকআপের দিকে না গিয়ে তিনি রেখেছেন পরিমিতি। হাতে ছিল ছোট্ট বটুয়া ব্যাগ, যা ঐতিহ্যবাহী সাজের সঙ্গে মানানসই। এই লুকে কোনো কৃত্রিম জৌলুস নেই, আছে আত্মবিশ্বাস আর নিজস্বতার প্রকাশ। নকশিকাঁথার সূক্ষ্ম কাজই হয়ে উঠেছে মূল আকর্ষণ।
বর্তমান সময়ে যখন ফ্যাশন দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখন শেকড়ের টান ধরে রাখা সহজ নয়। কিন্তু এমন উপস্থাপন প্রমাণ করে দেশীয় ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরলে তা বিশ্বদরবারেও সমান গ্রহণযোগ্যতা পায়।
নকশিকাঁথার মতো একটি লোকশিল্প, যা একসময় ছিল গ্রামীণ নারীর ব্যক্তিগত আবেগের প্রকাশ, আজ তা হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের অংশ। আর সেই যাত্রায় বাঁধনের মতো তারকারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। পেঁয়াজরঙা সেই শাড়িতে বাঁধনের উপস্থিতি যেন এক নীরব বার্তা দেয়, নিজের সংস্কৃতিকে ধারণ করেই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়ানো যায়। ঐতিহ্যকে লুকিয়ে নয়, গর্বের সঙ্গে তুলে ধরাই হতে পারে সত্যিকারের আধুনিকতা।
জেএস/