খুলনার মানুষের কাছে নব্বইয়ের দশকের নান্দনিক স্থাপনা হিসেবে সুপরিচিত ছিল খুলনার শিববাড়ি মোড়ে নির্মিত ‘জিয়া হল’। নানান প্রতিকূলতায় নির্মিত জিয়া হল ছিল যুগের থেকেও কয়েক ধাপ এগিয়ে। কিন্তু ‘জিয়া হলের’ এখন আর কোনো অস্তিত্বই নেই। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ‘জিয়া হল’ এর নাম পরিবর্তন করে ‘পাবলিক হল’ নামকরণও করা হয়েছিল। একটা পর্যায়ে হলটি ব্যবহার অনুপোযোগী দেখিয়ে ভেঙে ফেলে খুলনা সিটি করপোরেশন। এখন সেখানে ‘আধুনিক সিটি সেন্টার’ নির্মাণ করবে কেসিসি। তবে জিয়া হল পুনর্নিমাণের দাবি জানিয়েছেন খুলনার নাগরিক সমাজ।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, নব্বই দশকের নান্দনিক স্থাপনা খুলনার জিয়া হল ভবন দ্বিতল গ্যালারি বিশিষ্ট মিলনায়তন ও আধুনিক সকল সুবিধাসংবলিত অবস্থায় ছিল। এই ভবন ছিল সভা-সমাবেশ, নাটকসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত বিশাল এ কমপ্লেক্স ছিল খুলনা নগরীর একটি স্থাপনা। দুই ভাগে বিভক্ত হলটির দুইতলা বিশিষ্ট গ্যালারিসহ বিশাল মিলনায়তন ছিল। মূল মিলনায়তনে এক হাজার ৬৫টি আসন ছিল। ছোট সভার জন্য ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ১৯০ আসনের আলাদা সেমিনার কক্ষ।
এছাড়া আড়াই হাজার বর্গফুট আয়তনের দুটি লাউঞ্জ, মঞ্চ সংলগ্ন আসবাবপত্র কক্ষ, তিনটি মহরত কক্ষ, একটি বিশ্রাম কক্ষ, দুটি লেডিস কর্নার, একটি নামাজ ঘর, মেকআপ কক্ষ ও অফিসসহ অন্যান্য সুবিধা ছিল হলে। কিন্তু মাত্র ১৮ বছর ব্যবহারের পরই আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে ২০১০ সালে বন্ধ হয়ে যায় এই হল। এরপর প্রায় এক যুগ পরিত্যক্ত থাকার পর নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু বিপুল টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিশাল ভবনটি মাত্র ১৮ বছরে ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণার কারণ অনুসন্ধান করেনি কেসিসি।
কেসিসি সূত্রে জানা যায়, জিয়া হল কমপ্লেক্সটি নির্মাণ হয়েছে কয়েকটি ধাপে। ১৯৭৮ সালের ১২ জানুয়ারি হলের জন্য জমি হস্তান্তর করে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। তৎকালিন সময়ে সেখানে পৌরসভার কিছু জমি ছিল। ১৯৭৯ সালে মোট এক দশমিক ৭২১৭ একর জমির ওপর হলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে আইনজীবী এনায়েত আলী খুলনা পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। পরের দুই বছর ২৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৯৪টি পাইল স্থাপন করা হয়। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর হলের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রায় আট বছর কাজ বন্ধ ছিল। এরপর ১৯৮৯ সালে তৎকালীন মেয়র কাজী আমিনুল হক আবার হলের নির্মাণকাজ শুরু করেন। পরের বছর আবার কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯১ সালে কেসিসির মেয়রের দায়িত্ব পান তৈয়েবুর রহমান। তার সময় হলের মূল সুপার স্ট্রাকচারের নির্মাণকাজ শুরু হয়। বাইরে থেকে দৃশ্যমান বর্তমান স্থাপনাটি নির্মাণের জন্য ব্যয় হয় এক কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ১৯৯২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া হলের উদ্বোধন করেন। তখন এর নামকরণ হয় ‘জিয়া হল’। ১৯৯২ সালের ২৯ নভেম্বর মূল ভবনের কাজ শেষ হয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে হলের নামকরণ নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। সেই সময় থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সরকারি অনুষ্ঠানগুলোতে জিয়া হলের পরিবর্তে দাওয়াত কার্ড বা পোস্টারে ‘পাবলিক হল’ লেখা হতো। কোনো এক রাতে হলের নামফলকও সরিয়ে ফেলে দুর্বৃত্তরা। পরে প্রথম নির্বাচিত মেয়র তৈয়েবুর রহমান স্টিল দিয়ে হলটির নামফলক পুনঃস্থাপন করেন। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবাল জিয়া হলের সংস্কার কাজের জন্য দুই কোটি টাকা বরাদ্দের নির্দেশ দেন।
২০০৮ সালে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তালুকদার আবদুল খালেক মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি বরাদ্দকৃত টাকা সংস্কারকাজে না লাগিয়ে জিয়া হলের স্থানে ‘সিটি সেন্টার’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি, হয়নি সংস্কার কাজও। আর এ কারণে ২০১১ সাল থেকে মূল মিলনায়তন এবং ২০১২ সাল থেকে পুরো জিয়া হলের ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর জিলা হল কমপ্লেক্স পরিত্যক্ত ঘোষণার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে কেসিসি। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১৩ মে বিভাগীয় কমিশনারকে আহ্বায়ক ও কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করে কনডেমনেশন কমিটি করে মন্ত্রণালয়। কমিটি ২০১৪ সালের ৩ জুন ভবনের মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি করে দেয়। ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ প্রতিবেদন জমা দেয় এ কমিটি। ২০১৯ সালের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
২০১৯ সালের ২৬ জুন হল নিলামের জন্য দরপত্র আহ্বান করে কেসিসি। মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে পাঁচ দফা নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু কোনো ঠিকাদারই নিলামে অংশ নেননি। ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর সৌরভ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৪৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা দিয়ে জিয়া হলের ভগ্নাবশেষ কিনতে মেয়রের কাছে আবেদন করে। এই আবেদন সাধারণ সভায় উত্থাপন হয়। ২০২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর সৌরভ এন্টারপ্রাইজের নিলাম আবেদন অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ভেঙে ফেলা হয় জিয়া হল।
কেসিসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জিয়া হল’ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে। একাধিকবার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। ক্ষমতার জোরে তৎকালীন মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বিভিন্ন কমিটি তৈরি করিয়ে জিয়া হল ভেঙে ফেলার জন্য প্রয়োজনীয় ইস্যু তৈরি করে কাগজপত্র তৈরি করতে নির্দেশ দেন। কাগজপত্রে বৈধতা এনে ‘জিয়া হল’ ব্যবহার অনুপোযোগী আর ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। কারণ দেখানো হয় ‘খুলনা লবণাক্ত এলাকা’ হওয়া এবং হলটিতে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করাতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, খুলনা লবণাক্ত এলাকা হলেও কোনো পাকা ভবন ৬০-৭০ বছরের আগে ব্যবহারের অনুপযুক্ত হওয়ার কথা নয়। খুলনায় পাকিস্তান ও ব্রিটিশ আমলে নির্মিত একাধিক ভবন এখনো ব্যবহারের উপযোগী রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জিয়া হল ভাঙার জন্য পাঁচ দফা নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও কোনো ঠিকাদারই নিলামে অংশ নেননি। আসলে একটি অক্ষত জিনিসকে জীবন্ত কবর দেওয়ার পক্ষপাতিত্ব কেউ করছিলেন না।
নগরীর ময়লাপোতার স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ চৌধুরি বলেন, আমরা ছোটবেলায় ময়লাপোতা থেকে জিয়া হলে যেতাম। ২০০৩-০৪ সালে জিয়া হলে বিভিন্ন সভা সমাবেশ হতো। জিয়া হল খুলনাবাসীর আবেগ মেশানো একটি জায়গা ছিল। জিয়া হলের কারণে শিববাড়ি মোড় সবসময় জমজমাট থাকতো। কিন্তু ২০১২ সালের পর জিয়া হল পরিত্যক্ত করে দেওয়া হয়। এরপর ওই চত্বরে মাদকের আখড়া বসতো। মাঝে মধ্যে মেলা বসতে দেখলেও মন থেকে সেখানে যাওয়ার অনুভূতি পাইনি। তবে জিয়া হল একই নকশায় পুননির্মাণ করা হলে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে।
নগরীর শেখপাড়া এলাকার হাবিব সরদার বলেন, ‘জিয়া হল’ ভেঙে ফেলা হয়েছে মনে পড়লে কষ্ট লাগে। কলেজে থাকাকালীন জিয়া হল চত্বরে আড্ডা দিতে যেতাম। খুলনা শহরে বহু পুরাতন বিল্ডিং সংস্কার করে সচল রাখা হয়েছে। ‘জিয়া হল’ টেকসই ছিল এবং অনেক বড় জায়গা নিয়ে নির্মিত ছিল। সরকার চাইলে সংস্কার করে ‘জিয়া হল’ কে রক্ষা করতে পারতো। তবে ‘জিয়া হল’ পুননির্মাণ করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, নব্বই দশকের নান্দনিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত ‘জিয়া হল’ সবার কাছে সুপরিচিত। জিয়া হলে সভা-সমাবেশ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার সুযোগ ছিল। তৎকালীন সময়ে আধুনিক সুবিধা সংবলিত হলটি এই যুগেও প্রতিনিধিত্ব করতে পারতো।
তিনি আরও বলেন, জিয়া হলের নাম একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়। একবার পাবলিক হল, একবার জিয়া হল করা হয়- যেখানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা লক্ষ্য করা যায়। হলটি ভেঙে না ফেলে সংরক্ষণ করা যেত। কিন্তু তা করা হয়নি। আমরা ‘জিয়া হল’ পুনরায় নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবির উল জব্বার বলেন, ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে পড়াতে ‘জিয়া হল’ কনডেমড ঘোষণা করা হয়েছিল। জিয়া হলের স্থানে সিটি সেন্টার নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে। সিটি সেন্টার নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১৮ কোটি টাকা। ব্যয় পরবর্তীতে বৃদ্ধি পেতে পারে আবার কমতেও পারে বলে তিনি জানান।
এফএ/জেআইএম