ফিচার

নারী-শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে, কী ভাবছে এই প্রজন্ম?

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় নারী ও শিশু ধর্ষণ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দেয় আমরা অন্ধের দেশে আয়না বিক্রি করছি। নিত্যদিন ঘটে চলা বীভৎস ঘটনাগুলোর প্রভাব কি আমরা ভেবে দেখছি? সমাজের বৃহৎ অংশজুড়ে থাকা এই নারী ও শিশু আজ ভালো নেই নানা প্রতিবন্ধকতা, অনিয়ম আর বাধার শেকলে। নারী ও শিশুদের বঞ্চিত রেখে সমাজে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই নারী ও শিশুদের প্রতি হওয়া সব বৈষম্য নিরশনে দৃষ্টি প্রদান জরুরি।

সেই সঙ্গে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, নারী সহিংসতা বন্ধ করতে হবে এবং শিশুদের নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশ প্রদান এখন সময়ের দাবি। আজকের শিশুরা আগামীর ভবিষৎ। তাদের নিরাপদ শৈশব দিতে হবে। শিশুদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি শিশুদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ জরুরি। নারী ও শিশু সুরক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিমত তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম কলেজ শিক্ষার্থী তৈয়বা খানম-

আত্মরক্ষা ভয় নয় প্রস্তুতির ভাষাতাসনিয়া তাবাচ্ছুমশিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ

নারী ও শিশুর সুরক্ষা বলতে কেবল শারীরিক শক্তি প্রয়োগই নয়, সচেতনতা, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক প্রস্তুতির সমন্বিত এক রূপ। ভয়কে অস্বীকার না করে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাই আত্মরক্ষার প্রথম ধাপ। যেটি নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আত্মরক্ষামূলক কৌশল আয়ত্ত করা মানে সহিংসতার পথ বেছে নেওয়া নয়। বিপদের আগাম আভাস পাওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে রক্ষার কৌশল অবলম্বন করা এসবই আত্মরক্ষার অন্তর্ভুক্ত। শিশুদের ক্ষেত্রে অপরিচিতদের ‘না’ বলতে জানা, অপরিচিত কোনো আচরণ চিনতে পারা এবং সাহায্য চাইতে জানা এসবই আত্মরক্ষা। আর নারীদের ক্ষেত্রে আত্মরক্ষা বলতে বোঝানো হয় নিজের সীমা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা, তা রক্ষা করা এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যে কোনো খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারার কৌশল জানা। নারী ও শিশু সুরক্ষায় আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার ব্যাপারে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয় ও আইনী ব্যবস্থার পাশাপাশি আত্মরক্ষার প্রস্তুতিই পারে নারী ও শিশুকে আরও নিরাপদ এবং আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে।

নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে চাই মানবিক জাগরণখন্দকার বদিউজ্জামান বুলবুল শিক্ষার্থী, আনন্দ মোহন কলেজ

আজকাল টেলিভিশনে চোখ রাখলে কিংবা পত্রিকার পাতা উল্টালেই আমরা নারী ও শিশুর উপর নেমে আসা বীভৎস জুলুম আর নির্যাতনের শিরোনাম দেখতে পাই। কোমলমতি শিশুরা এই ধরায় সবচেয়ে সুন্দর ফুলগুলোর একটি, কিন্তু কিছু দুষ্টু প্রকৃতির মানুষেরা শিশুদের সুন্দর জীবন ও সুন্দর আগামীর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতে সরব। নারীদের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। পরিবার থেকে কর্মস্থল সর্বত্র নারীরা বঞ্চিত ও নির্যাতিত। নারীদের সরল স্বভাবকে পুঁজি করে অনেক প্রতারক তাদের প্রতারণার শিকারে পরিণত করে। অনেক সময় নারী ও শিশুদের বিদেশে পাচার করা হয়। সেখানে তাদের দিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক কাজ করানো হয়। বর্তমানে নারীর উপর সাইবার বুলিং ও স্লাট শেমিংয়ের মতো ঘৃণ্য কাজ করা হচ্ছে। এ থেকে উত্তোরণের জন্য এবং নারী ও শিশুদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক দায়িত্ববোধ। নারীদের নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত থাকতে হবে। অবৈধ প্রেমে জড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা অবৈধ প্রেম অনেক সময় নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপকর্ম সংঘটিত করে। সেই সঙ্গে নারী নির্যাতনের প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারলে নারী নির্যাতনের ঘটনা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা যেতে পারে ও নারী সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে।

নারী ও শিশু নিরাপত্তা সেল গঠন করতে হবে নুসরাত জাহান জেরিন শিক্ষার্থী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইন কলেজ

নারীরা আজও যথাযথ মর্যাদা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা, অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, পরিকল্পিত নির্যাতন, ধর্ষণ, ইভটিজিং, পারিবারিক সহিংসতা ও মানসিক নিপীড়ন এসব ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। সব ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। প্রকৃত অর্থে কয়জন ভুক্তভোগী সুষ্ঠু বিচার পায় সে প্রশ্ন আজো রয়ে গেছে। জন্মের পর থেকে একটি শিশুর যে মৌলিক অধিকার পাওয়ার কথা তা রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে অপুষ্টি ও নানা রোগে জর্জরিত সেই শিশুটি কৈশোরে পা দিয়েই অসচেতন পরিবার ও সমাজের চাপে বাল্যবিবাহের ফাঁদে পড়ে। অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সংসার জীবনে প্রবেশ করে সে পড়ে নানামুখী পারিবারিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের মধ্যে। শিশু ধর্ষণের নৃশংসতা ও ইভটিজিংয়ের আতঙ্ক থেকে আমরা এখনো মুক্ত হতে পারিনি। নারী ও শিশুদের জীবনযাত্রায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। নারী ও শিশুদের জন্য একটি কার্যকর নিরাপত্তা সেল গঠন জরুরি। যেখানে তারা নির্ভয়ে তাদের কষ্ট, বেদনা ও যন্ত্রণার কথা বলতে পারবে ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।

মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে হবে বরকত আলী শিক্ষার্থী ও সেচ্ছাসেবক, দিনাজপুর সরকারি কলেজ

মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা এটি সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম শর্ত। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা এই মৌলিক চাহিদাসমূহ যথাযথভাবে পূরণ করতে ব্যর্থ হলে মানবসমাজে নেমে আসে সংকটময় পরিস্থিতি ফলে সমাজে ধীরে ধীরে বৈষম্য ও অপরাধ দৃশ্যমান হতে থাকে। ফলে অন্যদের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু ও নারীরা।এই বাস্তবতায় শিশুরা শিক্ষা গ্রহণ থেকে ঝরে পড়ে এবং শিশু শ্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের অপুষ্টিজনিত সমস্যা বৃদ্ধি পায়। আর এভাবেই তারা একসময় বিপথগামী হয়। একই সাথে নারীরা মৌলিক চাহিদা বঞ্চিত হয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। ক্ষুধা ও দারিদ্রতা নারী ও শিশুদেরকে নির্যাতন ও শোষণের দিকে ঠেলে দেয়, যা সমাজকে আরও বিশৃঙ্খল ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত করে।অপরদিকে বাস্তবতা হচ্ছে শিশু ও নারীদের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য, নিরাপদ আশ্রয়, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাবে সমাজে তারা অবহেলার পাত্রে পরিণত হয়। বিপরীতে মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে শিশু ও নারীদের সুরক্ষা এবং নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সহজ হবে।

শিশুশ্রম বন্ধ করতে হবে মোঃ সাগর মিয়াশিক্ষার্থী, চন্দনবাইশা ডিগ্রি কলেজ, সারিয়াকান্দি

শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যত। তারা দেশ ও দশের সম্পদ। শিশুশ্রমের ভয়াবহতা দিনদিন বেড়েই চলছে। শিক্ষার অভাবে শিশুরা অল্প বয়সেই কাজ করছে। এতে স্বাভাবিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিশুদের শিল্প-কারখানা, ইটভাটা, হোটেল, রাস্তার ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বেশি দেখা যায়। শিশুশ্রমের প্রধান কারণ হলো দারিদ্র্যতা। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা পরিবারকে সহায়তা করতে বাধ্য হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগও শিশুশ্রম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। শিশুশ্রমের ফলে একটি প্রজন্ম অশিক্ষিত হয়ে গড়ে ওঠে। যা একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে।বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এ শিশুদের ন্যূনতম বয়স ১৪ আর কিশোরের বয়স ১৪-১৮ নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে ১৪ বছরের কম বয়সিদের কাজে নিয়োগ করা যাবে না। শিশুশ্রম বন্ধে সরকার,সমাজ ও পরিবারকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এছাড়াও বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণার সঙ্গে বিভিন্ন ফলপ্রসূ উদ্যোগ নিতে হবে। শিশুরা শ্রমিক নয়, তারা দেশের ভবিষ্যৎ সম্পদ। শিশুশ্রম বন্ধ করে শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সবার লক্ষ্য।

আরও পড়ুনদেউলিয়ার পর বন্ধ হয়ে গেল ব্রিটিশদের সেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’জমাট বরফে রক্তধারা, ৫০ লাখ বছরের গোপন রহস্য

কেএসকে