প্রতিবছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস এলে বিশ্বজুড়ে সমতা, অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম যাদের আমরা জেনারেশন জেড বা জেন-জি বলি তাদের কাছ থেকে সাধারণত বেশি উদার ও সমতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাশা করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক জরিপে উঠে এসেছে ভিন্ন এক বাস্তবতা। সেখানে দেখা যাচ্ছে, তরুণদের একটি বড় অংশ এখনো নারীর স্বাধীনতা, স্বাবলম্বী হওয়া ও ভূমিকা নিয়ে বেশ চমকপ্রদ ধারণা পোষণ করে।
বিশ্বের ২৯টি দেশের প্রায় ২৩ হাজার মানুষের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, জেন-জি পুরুষদের (জন্ম ১৯৯৭-২০১২) প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৪ শতাংশ) মনে করেন নারীদের খুব বেশি স্বাধীন বা স্বাবলম্বী হওয়া উচিত নয়। সেই তুলনায় বেবি বুমার প্রজন্মের পুরুষদের (জন্ম ১৯৪৬-১৯৬৪) মধ্যে এই মতামত রয়েছে মাত্র ১২ শতাংশের। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে তরুণ পুরুষদের মধ্যেই ঐতিহ্যবাহী লিঙ্গভূমিকার ধারণা বেশি শক্তভাবে উপস্থিত।
আরও পড়ুননারীবাদে নারীর প্রকৃত অবস্থান বনাম পুরুষতান্ত্রিক দ্বিচারিতা
জরিপে আরও দেখা গেছে, জেন-জি পুরুষদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) মনে করেন সংসারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে স্বামীরই শেষ কথা বলা উচিত। গ্রেট ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল ও ভারতের মতো দেশগুলোতে এই জরিপ পরিচালিত হয়েছে। এখানে একটি বড় প্রজন্মগত পার্থক্যও দেখা গেছে। বেবি বুমার প্রজন্মের পুরুষদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ মনে করেন স্ত্রীকে সবসময় স্বামীর কথা মেনে চলা উচিত। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই ধারণা তুলনামূলকভাবে বেশি। নারীদের মধ্যেও কিছুটা একই প্রবণতা দেখা যায়। জেন-জি নারীদের ১৮ শতাংশ মনে করেন স্ত্রীকে স্বামীর প্রতি বাধ্য থাকা উচিত, যেখানে বেবি বুমার নারীদের মধ্যে এই মতের সমর্থন মাত্র ৬ শতাংশ।
এই জরিপে দেশভেদেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন স্ত্রীকে স্বামীর কথা মেনে চলা উচিত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে এই মতের সমর্থন প্রায় ২৩ শতাংশ এবং ব্রিটেনে মাত্র ১৩ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, সংস্কৃতি, সমাজব্যবস্থা ও সামাজিক প্রত্যাশা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
জেন-জি পুরুষদের মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ মনে করেন নারীদের খুব বেশি স্বাধীন হওয়া ঠিক নয়। আবার একই প্রজন্মের অনেকেই মনে করেন সফল ক্যারিয়ার থাকা নারীরা পুরুষদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়। প্রায় ৪১ শতাংশ তরুণ পুরুষ এই মতের সঙ্গে একমত। অর্থাৎ নারীর সাফল্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি স্বাধীনতা নিয়ে এক ধরনের দ্বিধা এখনো রয়ে গেছে।
যৌনতা ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ধারণা দেখা যায়। জরিপে অংশ নেওয়া জেন-জি পুরুষদের ২১ শতাংশ মনে করেন, একজন ‘প্রকৃত নারীর’ কখনো যৌন সম্পর্কের সূচনা করা উচিত নয়। বেবি বুমার পুরুষদের মধ্যে এই ধারণা রয়েছে মাত্র ৭ শতাংশের।
আরও পড়ুনশ্রমজীবী নারীর আন্দোলন, একটি দিবসের সূচনা
জরিপে অংশ নেওয়া জেন-জি পুরুষদের ৫৯ শতাংশ বলেছেন, সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য পুরুষদের কাছ থেকে এখন খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা করা হয়। অনেকেই মনে করেন সমাজে পুরুষদের ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে নতুন ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
এই জরিপে দেখা গেছে, তরুণ পুরুষদের ওপরও কিছু কঠোর সামাজিক প্রত্যাশা কাজ করে। জেন-জি পুরুষদের ৩০ শতাংশ মনে করেন পুরুষদের বন্ধুদের ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলা উচিত নয়। আবার ২১ শতাংশ মনে করেন, যারা শিশুদের যত্নে বেশি অংশ নেয় তারা তুলনামূলক কম পুরুষালি। অর্থাৎ সমাজ শুধু নারীর জন্যই নয়, পুরুষদের জন্যও কিছু নির্দিষ্ট ছাঁচ তৈরি করে দিয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যক্তিগত মতামত ও সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে পার্থক্য। উদাহরণ হিসেবে ব্রিটেনের তথ্য বলছে, মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন শিশু যত্নের দায়িত্ব নারীদের বেশি নেওয়া উচিত। কিন্তু ৪৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন সমাজ নারীদের কাছ থেকে সেটিই প্রত্যাশা করে। এই ব্যবধান দেখায় যে সামাজিক ধ্যানধারণা অনেক সময় ব্যক্তিগত বিশ্বাসের চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করে।
এই জরিপের ফলাফল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারী-পুরুষ সমতার প্রশ্নটি এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। প্রযুক্তি, শিক্ষা ও আধুনিকতার যুগেও সমাজের গভীরে অনেক পুরোনো ধারণা রয়ে গেছে। তবে গবেষকদের মতে, এর পেছনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের বড় ভূমিকা থাকতে পারে। আগের প্রজন্মে পুরুষদের প্রধান পরিচয় ছিল পরিবারের উপার্জনকারী হিসেবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে চাকরি, আয় ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেক তরুণের জন্য আগের মতো সহজ নয়। ফলে অনেকেই নিজেদের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা অনুভব করেন।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস তাই শুধু উদযাপনের দিন নয়; এটি ভাবনারও একটি দিন। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং স্বাধীনতার ধারণা আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে পরিবার, শিক্ষা ও সমাজ সব জায়গায় সচেতনতা প্রয়োজন।কারণ সমতা কোনো এক পক্ষের জয় নয়; এটি এমন একটি সমাজ গড়ার পথ, যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই নিজেদের সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কেএসকে