ঝিনাইদহে বাসে অগ্নিসংযোগ ও তেল পাম্পে ভাঙচুরের অভিযোগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাত নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
রোববার (৮ মার্চ) দিনগত মধ্যরাতে শহরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে পৃথক দুটি মামলায় তাদের গ্রেফতার করা হয়। সোমবার (৯ মার্চ) দুপুরে তাদের আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ।
এদিকে মধ্যরাত থেকে ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের মারধর ও নির্যাতন করা হয়েছে বলে আসামিরা দাবি করেছেন। প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় চিৎকার তারা পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। একইসঙ্গে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ রয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
গ্রেফতাররা হলেন ঝিনাইদহ জেলা ‘দ্য রেড জুলাই’-এর আহ্বায়ক আবু হাসনাত তানাঈম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক সাইদুর রহমান, সদস্যসচিব আশিকুর রহমান জীবন, যুগ্ম আহ্বায়ক এজাজ আহমেদ অন্তর, কেন্দ্রীয় যুব শক্তির সদস্য তাশদীদ হাসান, রাসেল হুসাইন ও হুমায়ুন কবির।
সোমবার দুপুরে জেলা পুলিশ সুপারের প্রেস নোটে জানানো হয়, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন। যে কারণে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার (৭ মার্চ) রাত সাড়ে ৮টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য ফারদিন আহমেদ নিরব ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় তাজ ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে যান। ওইসময় পাম্পের কর্মচারীদের সঙ্গে তার তর্ক-বিতর্কের জেরে ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা তাকে মারধর করেন। আহত হয়ে মেসে চলে যান ফারদিন আহমেদ নিরব।
পরে অসুস্থতা বোধ করলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর হাসপাতালে তিনি মারা যান। ওই ঘটনার জেরে শনিবার রাতেই তিনজনকে আটক করে পুলিশ।
পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাজ ফিলিং স্টেশনের মালিকের মালিকানাধীন আরাপপুর সৃজনী ফিলিং স্টেশনে হামলা ও ভাঙচুর চালান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। রাত সোয়া ৩টার দিকে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি বাসে অগ্নিসংযোগ করেন আন্দোলনকারীরা।
আরও পড়ু্ন: পেট্রোল পাম্পে যুবক নিহতের ঘটনায় ভাঙচুর-আগুন, আটক ৩
অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রোববার সাইফ নোমান এবং ফিলিং স্টেশন ভাঙচুরের ঘটনায় শামসুল কবির মিলন বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা করেন। এসব মামলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাত নেতা-কর্মীকে আসামি করে আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ।
এদিকে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে আদালতে নেওয়ার পথে সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেন গ্রেফতার বৈষম্যবিরোধী নেতা-কর্মীরা। প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে চিৎকার করে তারা বলেন, ‘আমাদের ফাঁসানো হয়েছে। যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার সঙ্গে আমরা কেউ জড়িত নই।’
এসময় ন্যায়বিচার নিশ্চিতে গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে আসামিরা চিৎকার বলেন, আপনার সত্যটা তুলে ধরুন। তেল পাম্পে ভাঙচুর ও বাসে অগ্নিসংযোগের সময় আমরা সদর থানার ওসির সঙ্গে থানায় বসেছিলাম। থানার সিসি টিভি ফুটেজ প্রকাশ করার দাবিও জানান তারা।
প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় আসামিরা অভিযোগ করেন, আটকের পরে পুলিশ সদস্যরা ‘জুলাই যোদ্ধা’ হওয়ার কারণে নানাভাবে গালিগালাজ করেছে। তাদের হেনস্তা ও নির্যাতন করা হয়েছে। সাজানো মামলায় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জুলাই যোদ্ধাদের বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও প্রিজন ভ্যানে থাকা আসামিরা দাবি করেন। এসময় তারা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে থাকেন।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের বিষয়ে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে প্রেস নোট দেওয়া হয়েছে। তবে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে চাইলে তারা বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘আমরা আপনাদের প্রেস নোট দেবো। আর আমরা যা প্রমাণ করতে চাই, তা আদালতে উপস্থাপন করা হবে। আপাতত আমরা গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দিতে চাইছি না।’
শনিবার রাত ৮টার দিকে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের পাশে তাজ ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে গিয়ে হামলার শিকার হন শিক্ষার্থী ফারদিন আহমেদ নিরব। তিনি ঝিনাইদহ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সদস্য। তাজ ফিলিং স্টেশন ও সৃজনী ফিলিং স্টেশনের মালিক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হারুণ অর রশিদ। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান।
এম শাহাজান/এসআর/এএসএম