একুশে বইমেলা

১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধের নৌ-অভিযানগুলোর সামরিক বিশ্লেষণ

মাহমুদ নোমান

প্রত্যেক মানুষের মধ্যে নদী আছে। কবির উপমা নয়, সত্যিই। মায়ের বকুনি কিংবা প্রকৃতির সাথে নিজের ভেতরকার টানে ইছামতী নদীর পাড়ে বসে থাকতাম। চেয়ে থাকা, বসে থাকাতে কী আত্মিক টানের উপলব্ধি—এসবের অবিশ্বাসীরা বুঝবে না। মানুষের মধ্যে নদী সেটি শারীরিক ও মানসিক দুই ধারায় প্রবাহমান। হঠাৎ শরীর বিগড়ে গেলে কিংবা মনের চলন ব্যাহত হলেই টের পাওয়া যায়; আবার এ দেশের যে ভৌগোলিক ব্যাপ্তি, এটিও এদেশের মানুষের মধ্যে নদীর প্রবাহমান জীবনের সাথেও একাত্ম। আর এই দেশের অস্তিত্ব জানান দেওয়া ঘটনা কিংবা খুঁটি যদি বলি সেটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। ভৌগোলিক দাসত্বের শেকল থেকে মুক্তির চেয়ে মায়ের মুখের ভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।

সবারই জানা কথা যে, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। অর্থাৎ বাংলাদেশ নদী মায়ের দেশ। নদীকে মা ডাকা হয় শুধু বিশ্বাসে আশ্বাসে, এমনকি বাস্তবেই নদী এই দেশের মা। নদী দিয়েই এই দেশের অস্তিত্ব, চলন-বলন এমনকি মানুষের জীবন জীবিকা নির্বাহ; সেই দেশ মায়ের অর্থাৎ নদীর ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধে কীরকম প্রভাব বিস্তার লাভ করেছে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা মা সন্তানের জন্য কি না করতে পারেন। কী কী করতে পারেন সেটার দালিলিক প্রমাণ মোহাম্মদ এজাজের ‌‘১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধের নৌ-অভিযানগুলোর সামরিক বিশ্লেষণ’ বইটি।

ইতোপূর্বে মোহাম্মদ এজাজ এ দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ করে নদীর কথা মানুষের কাছে তুলে ধরতে নির্ভেজাল আকুতিভরা প্রাণ; নদীর ভাষার প্রীতি সম্মিলন ঘটিয়ে নিজের সম্পাদিত পত্রিকার নাম রেখেছেন ‘অববাহিকা’। সেই পত্রিকায় শুধু নদীর কথা ও ব্যথার ব্যঞ্জনা সৃজন। ‘১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধের নৌ-অভিযানগুলোর সামরিক বিশ্লেষণ’ বইটির শুরুর দিকে নদী আর এ দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের উপলব্ধির বিবিধ ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। এটির মাধ্যমে পাঠককে নিবিড়ভাবে সহায়ক ভূমিকায় আকৃষ্ট করেছেন; শুরুতে মুখবন্ধে মোহাম্মদ এজাজ এই বৃহৎ কলেবরের গ্রন্থটির আগাগোড়া নিয়ে আলোকপাত করেছেন।

আরও পড়ুনহোয়াই কাইন্ডনেস ম্যাটার্স: কেন আপনি দয়ালু হবেন 

এরপর ‘সভ্যতার ভিত্তি নদী’ লেখাটির মাধ্যমে এ দেশের নদীর হালচাল পাঠকের চোখে দেখিয়ে হৃদয়ে টোকা দিয়েছেন। লেখাটির পরে ভূরাজনীতি ও সামরিক ভূমিকায় নদী লেখাটি আরেক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কেননা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নদীর কথা বলতে গিয়ে এ অধ্যায়ে খোলাসা করলেন প্রাচীনকাল থেকে ১৯৭১-এর আগ পর্যন্ত এ দেশের যুদ্ধে নদী কীরূপ মাতৃত্বে আগলে রেখেছে। শুরুর দুটি অধ্যায় বইটির ভিত্তি বলা যেতে পারে। বইয়ের সহজ-সরল আলাপ পাঠককে মুহূর্তে অন্দরে প্রবেশ করাবে।

এ দুটি অধ্যায়ের পর ‘মুক্তিযুদ্ধে সামরিক প্রতিরক্ষায় নদী ও পরিবেশ’ শিরোনামে বাংলার ভূগোলের কৌশলগত মুক্তিযুদ্ধ, নদী- ভূকৌশলগত সুবিধা ও এক সহযোগী যোদ্ধা কিংবা বিভিন্ন যুদ্ধে নদীর ঐতিহাসিক ভূমিকা ও বঙ্গীয় বদ্বীপে নদীকেন্দ্রিক যুদ্ধকৌশলের কথা রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর সীমারেখার প্রধান নদ-নদী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা বইয়ের অমূল্য সংযোজন। এ অধ্যায়ে প্রত্যেক সেক্টরের মানচিত্র টেনে একেকটা নদীর চলন দেখিয়ে ক্ষান্ত হননি। এসব নদীর ভূমিকা যুদ্ধের সময়ের প্রমাণাদি উপস্থাপন করেছেন খোলাসা করে।

এ অধ্যায়ের শেষে ফয়সাল আহমেদ ও মোহাম্মদ এজাজের মধ্যে কথোপকথন এ বইয়ের পাঁচফোড়ন যেন। কেননা দুজনই নদী নিয়ে নির্ভেজাল ভাবুক। এ কথোপকথনে উঠে এসেছে নদী নিয়ে দুজনের ভাবনা, শ্রম ও জিজ্ঞাসা। কথা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের নদী ছিল এক হাজার ২৭৪টি আর এখন মাত্র ৭০০টি নদী! অর্থাৎ হারিয়ে গেছে ৫৭৪টি নদী। এই নদী এমনি এমনি হারিয়ে যায়নি। কতটা অত্যাচার ও অনাচারে হারিয়ে যাওয়া একেকটা নদীর কথা বইয়ে ছড়িয়ে আছে।

আরও পড়ুনবাংলা প্যাঁচাল: শান্তি নাই মুক্তি আছে 

১০ নম্বর সেক্টরকে নিয়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে আলোচনা এ গ্রন্থের মূল আকর্ষণ। কেননা এ সেক্টরের সীমানাই ছিল জলকেন্দ্রিক। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক সামরিক অভিযানগুলোর ঝরঝরে ভাষায় উপস্থাপন এবং এসবে বৈশ্বিক রাজনীতির বিবিধ আলাপ লেখক বিশেষ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। এতদিন জেনে এসেছি ‘অপারেশন জ্যাকপট’, ‘অপারেশন এক্স’, ‘অ্যামবুশ থিওরি’ ও ‘অ্যামবুশ অপারেশন’সহ নদীপথের নানান অভিযানের কথা কিন্তু এসবের বিস্তারিত জানার সুযোগ হয়নি। বইটি সেই রুদ্ধদ্বার উন্মোচিত করেছে। প্রত্যেকটি অভিযানের পরবর্তী ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত অতুলনীয় দক্ষতায় উপস্থাপন করেছেন।

সব সেক্টরে সংঘটিত নদী ভিত্তিক অভিযানে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, খেতাবপ্রাপ্ত, শহীদ এমনকি বধ্যভূমির মানচিত্র ও তালিকা দিয়ে বইকে করে তুলেছে এ দেশের প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের অবশ্য পাঠের অসামান্য দলিল। পাকিস্তানি সামরিক শক্তির দাম্ভিকতার বিপরীতে নদী মায়ের আশির্বাদ লেখকের লেখায় অনন্য মাত্রা পেয়েছে। পাকিস্তান ভেবেছিল সামরিক শক্তি যা আছে; সেটাতে বাংলাদেশ দাঁড়াতেই পারবে না। আসলেই বাংলাদেশ দাঁড়ায়নি, বুক চিতিয়ে দিয়েছে নদীর জলে। বাংলাদেশের আপামর সাধারণ জনগণ পাকিস্তানিদের মুখস্থ বিদ্যার পথযাত্রায় ব্রিজ ভেঙে দিয়েছিল সেদিন। পাকিস্তানিদের ধারণার বাইরে হামলা করেছিল নদীর জলের মমত্বে বুকে ভাসান দিয়ে।

বইয়ের নাম: ১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধের নৌ-অভিযানগুলোর সামরিক বিশ্লেষণলেখকের নাম: মোহাম্মদ এজাজপ্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৫প্রকাশনী: জাগতিক প্রকাশনপৃষ্ঠা: ৫৫৯মূল্য: ১৫০০ টাকা।

এসইউ