ধর্ম

হাদিসশাস্ত্রের অমর সাধক ইমাম বুখারী (রহ.)

আহমাদ সাব্বির

ইসলামি জ্ঞান-ঐতিহ্যের ইতিহাসে ইমাম মুহাম্মদ আল-বুখারী (রহ.) এমন এক মহীরুহ, যার অবদান ছাড়া হাদিসশাস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ কল্পনাই করা যায় না। কোরআন মাজীদের পর ইসলামের দ্বিতীয় প্রধান উৎস হিসেবে স্বীকৃত সুন্নাহকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে সংরক্ষণ ও বিশুদ্ধতার সর্বোচ্চ মানদণ্ডে উপনীত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা অনন্য ও তুলনাহীন। ইসলামী আইন ও ধর্মতত্ত্বের বিকাশে যে দুই প্রধান ধারার কথা উল্লেখ করা হয়—‘আহলুর রায়’ ও ‘আহলুল হাদিস’—ইমাম বুখারী ছিলেন দ্বিতীয় ধারার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। যুক্তিবাদী বিশ্লেষণের চেয়ে তিনি রাসুলুল্লাহর (সা.) বাণী, কর্ম ও অনুমোদনের নির্ভুল বর্ণনাকেই ইসলামী শরিয়তের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

হাদিস বলতে বোঝায় মহানবী হজরত মুহাম্মাদের (সা.) কথা, কাজ ও নীরব সমর্থন—যা মুসলিম জীবনের আদর্শ ও দিকনির্দেশক। হাদিস বা সুন্নাহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রথম যুগ থেকেই মুসলিম মনীষীরা সচেষ্ট ছিলেন। তবে সময়ের প্রবাহে মিথ্যা, দুর্বল ও বিভ্রান্তিকর বর্ণনা মিশে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে হাদিস যাচাই ও বিশুদ্ধকরণের প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে ওঠে। ঠিক এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে ইমাম বুখারী (রহ.) আত্মপ্রকাশ করেন এবং তার জীবনব্যাপী সাধনার মাধ্যমে হাদিসশাস্ত্রকে একটি সুসংহত ও প্রামাণ্য ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন।

ইমাম মুহাম্মদ আল-বুখারী (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪ হিজরি ১৩ই শাওয়াল, জুমার নামাজের পর। তার পূর্ণ নাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারী। তার পরিবার ছিল ধর্মপরায়ণ। প্রপিতামহ মুগীরা ছিলেন অগ্নিপূজক, কিন্তু ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং বুখারা নগরীর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ‘বুখারী’ উপাধি ধারণ করেন। তার পিতা ইসমাইল ছিলেন গভীর ধর্মনিষ্ঠ ও সচ্ছল ব্যক্তি। যদিও ইমাম বুখারী অল্প বয়সেই পিতৃহারা হন, তবুও মাতার স্নেহ, তত্ত্বাবধান ও প্রজ্ঞায় তার শিক্ষা ও চরিত্রগঠনে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। তার মাতা ছিলেন একজন জ্ঞানী ও ধার্মিক নারী, যিনি পুত্রের শারীরিক ও আত্মিক উভয় বিকাশেই গভীর মনোযোগ দিয়েছেন।

শৈশবকাল থেকেই ইমাম বুখারীর স্মরণশক্তি ছিল বিস্ময়কর। একবার শুনলেই হাদিসের সনদসহ পুরো বক্তব্য তার মুখস্থ হয়ে যেত এবং জীবনে আর ভুল হতো না। বাল্যকালে তিনি মুহাম্মদ ইবনে বিশা প্রমুখ খ্যাতনামা আলিমদের কাছে কোরআন ও হাদিস শিক্ষা লাভ করেন। অল্প বয়সেই হাদিসশাস্ত্রের প্রতি তার গভীর অনুরাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বসরা, কুফা ও মদীনায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করে তিনি জ্ঞানার্জনে আত্মনিয়োগ করেন। বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ছিলেন তার অন্যতম শিক্ষক। ইমাম হাম্বলের সাধুতা, নির্লিপ্ত জীবনবোধ ও সত্য অনুসন্ধানের দৃঢ়তা ইমাম বুখারীর চরিত্রে গভীর প্রভাব ফেলে।

মাত্র ষোল বছর বয়সেই তিনি ইবনে মোবারক ও ওয়াকীর গ্রন্থসমূহ মুখস্থ করেন এবং সমকালীন বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও তাফসীরকারদের রচনা ও মতাদর্শে সুপণ্ডিত হয়ে ওঠেন। প্রায় কুড়ি বছর বয়সে তিনি মাতা ও কনিষ্ঠ ভ্রাতার সঙ্গে মক্কায় গমন করেন। হজ পালন শেষে তিনি সেখানে দীর্ঘ সময় হাদিস সংগ্রহ ও গবেষণায় নিয়োজিত থাকেন। এই সময়েই তিনি ‘কদায়া আস-সাহাবা ওয়াত-তাবেয়ীন’ এবং ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘আল-তারিখুল কাবীর’ রচনা করেন। কথিত আছে, তিনি চাঁদের আলোয় রাসুলুল্লাহর (সা.) রওজা মোবারকের পাশে বসে এই ঐতিহাসিক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ইতিহাস বিষয়ে তার জ্ঞান এতই গভীর ছিল যে, তিনি বলতেন, ইতিহাসে এমন কোনো নাম নেই, যার পেছনের কাহিনি তার অজানা।

পরবর্তীকালে ইমাম বুখারী দীর্ঘ প্রায় চল্লিশ বছর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। দামেস্ক, মিসর, বসরা, বাগদাদ, হিজাযসহ বহু অঞ্চলে তিনি হাদিস সংগ্রহ করেন। যেখানে কোনো হাদিসবেত্তার সংবাদ পেয়েছেন, সেখানেই তিনি ছুটে গেছেন—দূরত্ব, কষ্ট বা বিপদের কথা বিন্দুমাত্র ভাবেননি। তার এই অক্লান্ত সাধনার একমাত্র লক্ষ্য ছিল বিশুদ্ধ হাদিস আহরণ। এ সময় তার লেখনীও ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। এমনকি গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে তিনি আলো জ্বালিয়ে নতুন চিন্তা বা তথ্য লিপিবদ্ধ করতেন।

নিশাপুরে স্থায়ীভাবে বসবাসের ইচ্ছা পোষণ করলেও সেখানকার শাসকের ঔদ্ধত্য ও বিরুদ্ধবাদীদের অপপ্রচারে তাকে শহর ত্যাগ করতে হয়। তার বিরুদ্ধে কোরআন ‘সৃষ্ট’ বলে মত দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়, যা সে সময় মারাত্মক বিতর্কের বিষয় ছিল। জন্মভূমি বুখারায় প্রত্যাবর্তনের পর প্রথমে তিনি সম্মানিত হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সেখান থেকেও বিতাড়িত হন। অবশেষে সমরকন্দের পথে যাত্রাকালে বখরাতং নামক স্থানে অসুস্থ হয়ে ২৬৫ হিজরী, ঈদুল ফিতরের প্রথম দিনে, ৬২ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। আজও সেখানে তার মাজার ইসলামী জ্ঞানসাধনার স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ব্যক্তিজীবনে ইমাম বুখারী ছিলেন সুন্নাহর এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় তিনি রাসুলুল্লাহর (সা.) আদর্শ কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন। নম্রতা, দয়া, সাধুতা ও আত্মসম্মান ছিল তার চরিত্রের প্রধান অলংকার। জ্ঞানার্জন ও হাদিস সংগ্রহই ছিল তার জীবনের একমাত্র ব্রত। পার্থিব ভোগ-বিলাস তিনি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছেন। তীরন্দাজি ও ঘোড়দৌড় ছিল তার প্রিয় খেলা—কারণ এগুলো রাসুল (সা.) পছন্দ করতেন। শাসক ও ধনীদের অনুগ্রহ গ্রহণ তিনি অপমানজনক মনে করতেন। বুখারার শাসকের সন্তানদের ব্যক্তিগতভাবে পড়ানোর আহ্বান তিনি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, জ্ঞান অর্জন করতে হলে শিক্ষার্থীকেই শিক্ষকের কাছে আসতে হবে।

হাদিস গ্রহণে তার সততা ও কঠোরতা কিংবদন্তিতুল্য। একবার কয়েকশ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এক হাদিসবেত্তার কাছে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেন, লোকটি ঘোড়াকে ধরতে খালি থলি দিয়ে প্রতারণা করছে। এই সামান্য অসততাই তার কাছে যথেষ্ট ছিল সেই ব্যক্তির বর্ণনা পরিত্যাগ করার জন্য। এমন সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসে পরিণত করেছে।

ইমাম বুখারী প্রায় ছয় লাখ হাদিস সংগ্রহ করেন, যার মধ্যে দুই লাখের মতো তার মুখস্থ ছিল। এই বিশাল ভাণ্ডার থেকে কঠোর যাচাই-বাছাই করে প্রায় নয় হাজার হাদিসকে ‘সহিহ’ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং আল-জামিয়ুস সহিহ বা সহিহ বুখারী সংকলন করেন। প্রতিটি হাদিস লিপিবদ্ধ করার আগে তিনি অজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করতেন। এই গ্রন্থ কোরআনের পর ইসলামের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। পরবর্তীকালে ফাতহুল বারী ও উমদাতুল কারীসহ অসংখ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হয়েছে সহিহ বুখারীর, যা মুসলিম জ্ঞানভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

ওএফএফ