আজ বিশ্ব কিডনি দিবস। কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, প্রতিরোধ ও দ্রুত শনাক্তকরণের গুরুত্ব তুলে ধরতেই বিশ্বজুড়ে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হয়। বাংলাদেশেও কিডনি রোগকে এখন বড় একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যার হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ এসব কারণে দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।
এই প্রেক্ষাপটে কিডনি রোগের বর্তমান পরিস্থিতি, ঝুঁকি ও প্রতিরোধ নিয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজির আবাসিক চিকিৎসক ডা. মীর রাশেদুল হাসান কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জান্নাত শ্রাবণী।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশে কিডনি রোগকে এখন কতটা বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যার হিসেবে দেখা হচ্ছে? সাম্প্রতিক পরিস্থিতি কেমন?ডা. মীর রাশেদুল হাসান: বর্তমানে বাংলাদেশে কিডনি রোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত।
এছাড়া বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কিডনি সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো অনেকেই জানেন না যে তাদের কিডনিতে সমস্যা শুরু হয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার নতুন রোগী কিডনি বিকলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এর প্রধান কারণ। অনেক রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে আসেন, তখন রোগটি ইতোমধ্যে অনেকটা অগ্রসর হয়ে যায়।
ছবি: আবাসিক চিকিৎসক ডা. মীর রাশেদুল হাসান
জাগো নিউজ: অনেকেই কিডনি রোগকে ‘নীরব ঘাতক’ বলেন। কেন এমন বলা হয়? রোগটি সাধারণত কোন পর্যায়ে গিয়ে ধরা পড়ে?ডা. মীর রাশেদুল হাসান: কিডনি রোগকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয় কারণ এটি দীর্ঘ সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই শরীরের ভেতরে ক্ষতি করতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা শুরুতে কোনো সমস্যা অনুভব করেন না। সাধারণত কিডনির কার্যক্ষমতা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি কমে গেলে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। তখন অনেক সময় রোগটি তৃতীয় বা চতুর্থ ধাপে পৌঁছে যায়। এই কারণে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাগো নিউজ: ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপকে কিডনি রোগের প্রধান কারণ বলা হয়। বাংলাদেশে এ দুই সমস্যার কারণে কিডনি রোগ কতটা বাড়ছে?ডা. মীর রাশেদুল হাসান: বর্তমানে কিডনি রোগের সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হলো ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, একই সঙ্গে অনেক মানুষের রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে থাকে না। ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ফলে ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে থাকে।
জাগো নিউজ: তরুণদের মধ্যেও কিডনি সমস্যার কথা এখন শোনা যায়। জীবনযাপন বা খাদ্যাভ্যাসের কোন পরিবর্তনগুলো এর জন্য বেশি দায়ী?ডা. মীর রাশেদুল হাসান: আগে কিডনি রোগকে সাধারণত বয়স্কদের সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন তরুণদের মধ্যেও এই রোগ বাড়ছে। এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, স্থূলতা, ধূমপান এবং ঘুমের অনিয়ম এসব বিষয় কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে এগুলো কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
এছাড়া তরুণরা দিন দিন মাদকের দিকে আসক্ত হচ্ছে যা কিডনির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে আমাদের দেশে অনেক তরুণ মধ্যপ্রাচ্য কাজ করতে যায়। আর সেখানে কাজ করতে গেলে সেখানে ডিহাইড্রেশনে ভোগে। বিশেষ করে সেখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে তারা অভ্যস্ত না, যে কারণে অনেকেই কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে ফিরে আসে।
জাগো নিউজ: ব্যথানাশক ওষুধ বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়ার প্রবণতা আমাদের দেশে অনেক বেশি। এতে কিডনির কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে?ডা. মীর রাশেদুল হাসান: আমাদের দেশে অনেকেই মাথাব্যথা বা শরীরব্যথা হলেই সহজে ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে থাকেন। কিন্তু দীর্ঘদিন বা অতিরিক্ত মাত্রায় এসব ওষুধ গ্রহণ করলে কিডনির ওপর গুরুতর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে কিছু ব্যথানাশক ওষুধ কিডনির রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়, যার ফলে ধীরে ধীরে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত কোনো ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়। এছাড়া দীর্ঘদিন টানা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেলেও তা কিডনির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
জাগো নিউজ: একজন মানুষ কীভাবে বুঝবেন তার কিডনিতে সমস্যা শুরু হয়েছে? এমন কোনো প্রাথমিক লক্ষণ আছে, যেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত?ডা. মীর রাশেদুল হাসান: কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় খুব স্পষ্ট হয় না। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই সতর্ক হওয়া উচিত। যেমন-শরীর বা পা ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ বা রঙে পরিবর্তন, প্রস্রাবে ফেনা হওয়া, দুর্বলতা বা ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা, উচ্চ রক্তচাপ। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ছবি: আবাসিক চিকিৎসক ডা. মীর রাশেদুল হাসান
জাগো নিউজ: কিডনি রোগ প্রতিরোধের জন্য বছরে অন্তত একবার কোন কোন পরীক্ষা করা প্রয়োজন?ডা. মীর রাশেদুল হাসান: কিডনি রোগ প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত কিছু সহজ পরীক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- রক্তে ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা, প্রস্রাবের সাধারণ পরীক্ষা, রক্তচাপ পরিমাপ, রক্তে শর্করা পরীক্ষা। বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।
জাগো নিউজ: অনেকের ধারণা বেশি পানি খেলেই কিডনি ভালো থাকে। বাস্তবে পানি পান নিয়ে সঠিক নিয়ম কী?ডা. মীর রাশেদুল হাসান: পানি অবশ্যই শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অতিরিক্ত পানি পান করাও সব সময় প্রয়োজন হয় না। সাধারণভাবে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে আড়াই লিটার পানি পান করাই যথেষ্ট। তবে গরম আবহাওয়া, বেশি শারীরিক পরিশ্রম বা ঘাম হলে পানির প্রয়োজন বাড়তে পারে। আবার যাদের কিডনি রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি পান করতে হয়।
জাগো নিউজ: বর্তমানে দেশে ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপনের সুবিধা কতটা সহজলভ্য? রোগীরা কোন বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন?ডা. মীর রাশেদুল হাসান: বাংলাদেশে এখন অনেক সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের সুবিধা রয়েছে। তবে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক অনেক বেশি হওয়ায় সবার জন্য এটি সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো চিকিৎসার ব্যয়। ডায়ালাইসিস দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা। একইভাবে কিডনি প্রতিস্থাপনও অনেক রোগীর জন্য অর্থনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে।
জাগো নিউজ: কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে খাদ্যাভ্যাসে কী ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি?ডা. মীর রাশেদুল হাসান: কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য খাদ্যাভ্যাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত লবণ কম খাওয়া, অতিরিক্ত প্রোটিন এড়িয়ে চলা এবং পটাশিয়াম ও ফসফরাসযুক্ত খাবার নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তবে রোগের ধাপ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা ভিন্ন হতে পারে। তাই একজন পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণ করা উচিত।
জাগো নিউজ: গ্রাম ও শহরের মধ্যে কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতনতার পার্থক্য কতটা? এই সচেতনতা বাড়াতে কী উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন?ডা. মীর রাশেদুল হাসান: শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তুলনামূলক কম। অনেক সময় মানুষ রোগের লক্ষণ বুঝতে পারেন না বা দেরিতে চিকিৎসকের কাছে যান। সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য ক্যাম্পের আয়োজন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: ঈদ প্রস্তুতিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চিকিৎসকের বিশেষ পরামর্শ রোজায় গ্যাস্ট্রিক ও পেটের যত্নে মানুন চিকিৎসকের পরামর্শ জয়েন্টের ব্যথা কি স্বাভাবিক? যা বলছেন চিকিৎসকজাগো নিউজ: বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষে সাধারণ মানুষের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবার্তা কী?ডা. মীর রাশেদুল হাসান: আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো কিডনি রোগ প্রতিরোধযোগ্য, যদি আমরা সচেতন হই। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, লবণ কম খাওয়া, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না খাওয়া এই সহজ অভ্যাসগুলোই আমাদের কিডনি সুস্থ রাখতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
জাগো নিউজ: আমাদের আয়োজনে আসার জন্য অনেক ধন্যবাদ।ডা. মীর রাশেদুল হাসান: আপনাকেও ধন্যবাদ।
জেএস/