চাহিদা না থাকার পরও উত্তোলনে বাধ্য হওয়ায় অতিরিক্ত কয়লা নিয়ে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি এবং পাথর নিয়ে মধ্যপাড়া পাথর খনি বিপদে পড়েছে। কয়লা ও পাথর রাখার স্থান সংকুলান না হওয়ায় এখন উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে উৎপাদন।
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির দুই লাখ টনের ধারণক্ষমতার ইয়ার্ডে এখন প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন কয়লা মজুত হয়েছে। স্তূপের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় প্রায়ই কয়লায় আগুন ধরে যাচ্ছে। এতে যেমন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তেমনি পুড়ে নষ্টও হচ্ছে কয়লা।
জানা যায়, ২০১৯ সাল থেকে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উৎপাদিত কয়লার একমাত্র ক্রেতা বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র। বাইরে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিটগুলো একের পর এক অচল হয়ে পড়ায় এবং সংস্কার কাজে দীর্ঘসূত্রতার কারণে কয়লার ব্যবহার ও মজুতে বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে।
খনিতে দৈনিক গড়ে তিন হাজার টন কয়লা উত্তোলন হলেও চাহিদা মাত্র ৭০০ টন। প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ৩০০ টন কয়লা অতিরিক্ত মজুত হচ্ছে। ফলে কয়লার স্তূপের উচ্চতা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে।
কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, এর আগে কয়লা টেন্ডারের মাধ্যমে খোলা বাজারে বিক্রি হত, তাই উৎপাদন ও বিক্রির মধ্যে সামঞ্জস্য ছিল। এতে মজুতের সমস্যা ছিল না। তখন বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মোট ক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট ছিল এবং দৈনিক কয়লার চাহিদা ছিল সাড়ে চার হাজার টন। ২০২০ সালে ২ নম্বর ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, বর্তমানে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ১ নম্বর ইউনিটটি চালু আছে। যেখানে দৈনিক কয়লার চাহিদা মাত্র ৭০০ টন। এছাড়া ওভারহোলিংয়ে থাকা ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৩ নম্বর ইউনিট চালু করতে আরও তিন মাস সময় লাগবে। এই ইউনিটে দৈনিক কয়লার চাহিদা দুই হাজার ২০০ থেকে আড়াই হাজার টন।
আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, আমরা খনি কর্তৃপক্ষকে কয়লা উত্তোলন বন্ধ রাখতে বললেও তারা অব্যাহত রাখে। এতে অতিরিক্ত তিন লাখ টন কয়লা মজুত হয়েছে। কয়লা উত্তোলন বন্ধ রাখলে এমন সমস্যা হত না। অতিরিক্ত কয়লা নিয়ে আমরা কী করব?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং লিমিটেড-বিসিএমসিএল এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) খান মো. জাফর সাদিক বলেন, সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী কয়লা উত্তোলন করছে চীনের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা চাইলেও চলমান এই কয়লা উত্তোলন প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা সম্ভব না। ভূগর্ভে নানা জটিলতা ও দুর্ঘটনা এড়াতে কয়লা উত্তোলন চালিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম বলেন, ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ কয়লা জমে স্তূপ তৈরি হয়েছে এবং প্রায়ই সেখানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ চুক্তি অনুযায়ী কয়লা গ্রহণ করতে না পারার কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র কাঙ্ক্ষিত হারে কয়লা নিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
একই অবস্থা বিরাজ করছে মধ্যপাড়া পাথর খনিতে। পাথর বিক্রি কম হওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়েছে দিনাজপুরের পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি (এমজিএমসিএল)। খনির তিনতলা ভবন পর্যন্ত ছুঁইছুঁই করছে পাথরের মজুত। বর্তমানে খনির ২৫টি ইয়ার্ডে পড়ে আছে প্রায় ৪২০ কোটি টাকার ১৪ লাখ ৪৬ হাজার টন পাথর। প্রকল্পে পাথর উত্তোলন বাড়লেও বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে প্রতি মাসেই মজুতের পরিমাণ বাড়ছে। এতে ব্যয় মেটাতে খনিটি পড়েছে দেনার মুখে।
দেশে বছরে পাথরের চাহিদা প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ টন। এর মধ্যে শুধু রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ২ হাজার ৯৫৫ কিলোমিটার রেলপথে প্রতি বছর ১ কোটি (ঘনফুট) পাথর প্রয়োজন হয়। এছাড়া নদীশাসনসহ অন্যান্য সরকারি উন্নয়ন কাজে ব্যবহার হয় পাথর। এসব পাথরের সিংহভাগ আমদানি হয় ভারত, ভুটান, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া থেকে।
খনিসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, চুক্তিবদ্ধ ৮০/১২০ বোল্ডার ও ৪০/৬০ সাইজের পাথর বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড না নেওয়ায় আগামী ২৫ মার্চের মধ্যে খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকট হয়ে উঠেছে। খনি বন্ধ হলে প্রতিদিনই বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে প্রতিষ্ঠানটি। এতে সরকারের লাখ লাখ টাকার রাজস্ব আয় কমবে।
মধ্যপাড়া খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, মধ্যপাড়া খনির পাথরের মান ভালো হলেও আমদানির পাথরেই ঝোঁক বেশি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দরপত্রে মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। এতে সরকার হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব। অন্যদিকে ধারদেনা করে খনির ঠিকাদারের বিল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হচ্ছে।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও সেবা) সৈয়দ রফিজুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে খনির ইয়ার্ডে মজুত পাথর ১৪ লাখ ৪৬ হাজার টন। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৬০ মিমি আকারের ব্লাস্ট ৯ লাখ টন, ৮০/১২০ বোল্ডার ৩ লাখ ৬৭ হাজার টন। বর্তমানে খনি থেকে ৬ সাইজের পাথর উৎপাদন হচ্ছে।
এমজিএমসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী ডিএম জোবায়েদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীশাসন কাজে পাথর ক্রয় না করায় ইয়ার্ড পূর্ণ এবং বিদেশ থেকে নিয়ে আসা ডেটোনেটরের (বিস্ফোরক) ওপর রয়্যালটি না কমানোয় পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে খনির পাথর ব্যবহার নিশ্চিত করলে দেশের একমাত্র পাথর খনিটি প্রাণ ফিরে পাবে। দেশের ডলার সাশ্রয় হবে।
এফএ/এএসএম