ঘরজুড়ে কলার গাছ দিয়ে সাজানো কৃত্রিম এক মন্দির। মাঝরাতে চলে তথাকথিত ‘ভর’ নামানোর আধ্যাত্মিক আয়োজন। বাড়ির ভেতর বাইরের কারো প্রবেশাধিকার নেই। রুদ্ধদ্বার ঘরে চলে মায়াবী হাড়ির মোহ আর গুপ্তধন পাইয়ে দেওয়ার রুদ্ধশ্বাস নাটক। লালমনিরহাট সদর উপজেলার হারাটি ইউনিয়নের ফকিরটারি গ্রামে এভাবেই সাজানো হয়েছিল এক ভয়ঙ্কর প্রতারণার জাল।
কোটি টাকার সোনার মোহর আর প্রাচীন হীরা লুকিয়ে থাকা এক ‘রহস্যময়’ মাটির হাড়ির গল্পে প্রলুব্ধ হয়ে পথে বসেছে ওই গ্রামের অন্তত সাতটি পরিবার। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ডাকাতি নয়, বরং কথিত এক কবিরাজের অলৌকিক ক্ষমতার মোহে পড়ে জমি-জমা ও জীবনের সব সঞ্চয় হারিয়ে এখন আক্ষরিক অর্থেই সর্বস্বান্ত তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা আম্বিয়া বেগমের বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই শিউরে ওঠার মতো প্রতারণার চিত্র। তিনি জানান, অভিযুক্ত কবিরাজ জিপু ও তার সহযোগীরা মিলে টার্গেট করা বাড়িতে গভীর রাতে আসর বসাতো। ওনারা দুই-তিনজন মিলে আসতো। ঘরের ভেতর কলার গাছ দিয়ে মন্দিরের মতো কিছু একটা তৈরি করতো। মন্ত্র পড়তো আর বলতো তাদের ওপর নাকি আধ্যাত্মিক শক্তি ভর করেছে, যা দিয়ে সব দেখা যায়। দুপুর বা মাঝরাতে এসব চলতো। হাড়ি আর কলার ঝুঁকি নিয়ে আসতো তারা। আশপাশের কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিতো না।
কৌতূহলবশত একদিন বেড়ার ওপর দিয়ে উঁকি দিয়ে আম্বিয়া দেখেন, তার ভাসুরও সেই আসরে বসা। পরে তিনি জানতে পারেন, এভাবেই ধাপে ধাপে কারো কাছ থেকে ৫০ হাজার, কারো কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিলো চক্রটি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতারক চক্রটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে গ্রামের সহজ-সরল ও ধর্মপ্রাণ মানুষদের লক্ষ্যবস্তু বানাতো। কখনো পরিবারের অসুস্থ সদস্য, আবার কখনো ছোট সন্তানদের ওপর ‘অশুভ দৃষ্টি’র ভয় দেখিয়ে বিশেষ যজ্ঞের নামে টাকা আদায় করা হতো।
প্রতারণার শিকার ওয়েদুল ইসলাম জিয়া বলেন, জিপুর (কথিত কবিরাজ) কথায় বিশ্বাস করে আমরা শেষ সম্বলটুকু তার হাতে তুলে দিয়েছি। এখন সে পলাতক। রোগমুক্তি বা গুপ্তধন কোনোটিরই দেখা মেলেনি, উল্টো আমরা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, চক্রটি কারো কাছ থেকে ৩-৪ লাখ, এমনকি ১১ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে।
গ্রামবাসীর অভিযোগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ফকিরটারি গ্রামেরই বাসিন্দা জিপু ওরফে জিল্লুর রহমান। ঘটনার পর থেকে সে পলাতক। জিপুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সেখানে কেউ নেই।
তার পরিবারের সদস্যরা জানান, গত কয়েক বছর ধরে তিনি বাড়িতে থাকেন না। এমনকি প্রতারণায় ব্যবহৃত মোবাইল সিমটি তার ছোট ভাইয়ের নামে নিবন্ধিত থাকলেও সেটি বর্তমানে বন্ধ পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় লালমনিরহাট সদর থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। লালমনিরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মতিন জানান, প্রতারণার বিষয়ে আমরা একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।
মহসীন ইসলাম শাওন/এমএন/জেআইএম