পবিত্র কুরআনের সুমধুর তিলাওয়াতে যিনি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে পরিচিত করেছেন ‘কুরআনের পাখি’ হিসেবে সেই বিশ্বজয়ী হাফেজ কারি আবু রায়হানকে মালয়েশিয়ায় সংবর্ধনা জানানো হয়েছে এক আবেগঘন আয়োজনে।
প্রবাসের মাটিতে কুরআনের প্রতি ভালোবাসা, দেশপ্রেম এবং শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক বন্ধনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে এই আয়োজন।
বাংলাদেশি ইয়ুথ অ্যালায়েন্স মালয়েশিয়া (বিয়াম)-এর উদ্যোগে মালয়েশিয়ার স্বনামধন্য মাহসা ইউনিভার্সিটি আয়োজিত বৃহৎ ইফতার মাহফিলে কারি আবু রায়হানকে সম্মাননা দেওয়া হয়। মাহসা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমপাথি অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
শুক্রবার, ১৩ মার্চ অনুষ্ঠিত এই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে মাহসা বিয়াম চ্যাপ্টার কমিটি। মালয়েশিয়ার প্রায় ২০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শতাধিক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এতে অংশগ্রহণ করেন। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনেও এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি যেন প্রমাণ করে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে বাংলাদেশিরা কতটা ঐক্যবদ্ধ।
ইফতারের আগ মুহূর্তে অডিটোরিয়ামের পরিবেশ ছিল আবেগঘন। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন কুরআনের সুমধুর তিলাওয়াত শোনার জন্য। যখন মঞ্চে ওঠেন কারি আবু রায়হান, তখন যেন পুরো হল নীরব হয়ে যায়। তার কণ্ঠে কুরআনের আয়াত ধ্বনিত হতেই উপস্থিত শ্রোতারা বিমুগ্ধ হয়ে পড়েন।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে কারি আবু রায়হানের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন বিয়াম সেন্ট্রাল প্রেসিডেন্ট বশির ইবনে জাফর। সম্মাননা গ্রহণের সময় আবু রায়হানের চোখে-মুখে ছিল বিনয় ও কৃতজ্ঞতার ছাপ।
এ সময় উপস্থিত সবাই করতালির মাধ্যমে তাকে অভিনন্দন জানান। অনেক শিক্ষার্থী জানান, প্রবাসে বসে এমন একজন বিশ্বজয়ী হাফেজের সঙ্গে দেখা হওয়া তাদের জন্য অনন্য এক অভিজ্ঞতা।
এই ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং, বিল্ট এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজির প্রভাষক মিস দিভাস্বীনি। তিনি বলেন, ধর্মীয় ও সামাজিক এমন আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাহসা অ্যাভিনিউ ইন্টারন্যাশনাল কলেজের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার ও বিয়াম সেন্ট্রাল প্রেসিডেন্ট বশির ইবনে জাফর।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পিএসআর গ্লোবাল কনসালটেন্ট-এর ফাউন্ডার প্রফেসর ড. জিয়াউল করিম, কিচেন কেয়ার অ্যাগ্রো ফুড-এর চিফ অপারেটিং অফিসার ইয়াসির আরাফাত, প্রাণ-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর মুহা. সেলিম ভুঁইয়া এবং এমডি গ্লোবাল রিসোর্স এসডিএন বিএইচডি-এর ডিরেক্টর মুহা. মোশারফ হোসেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিয়াম সেন্ট্রাল ভিপি মুশফিক ও উসামা, সেক্রেটারি রফিকুল, মাহসা বিয়াম চ্যাপ্টার প্রেসিডেন্ট তৌফিকুর রহমান মাহফুজ, অ্যাডভাইসর সিতাবুর রহমান জিৎ এবং সেক্রেটারি দীপ্ত হালদারসহ অনেক প্রবাসী শিক্ষার্থী ও অতিথি।
কিফায়াতুল্লাহ ও নাইলাতের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ইফতারের আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের মাঝে ছিল আনন্দ, আলাপচারিতা এবং দেশ নিয়ে স্মৃতিচারণ।
শিক্ষার্থীরা জানান, প্রবাসে থাকা অবস্থায় এমন আয়োজন তাদের মধ্যে একধরনের পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করে। নতুন শিক্ষার্থীদের জন্যও এটি ছিল পরিচিত হওয়ার একটি বড় সুযোগ।
একজন শিক্ষার্থী বলেন, আমরা অনেকেই পরিবার থেকে দূরে থাকি। এমন আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা সবাই একই পরিবারের অংশ।
অনুষ্ঠানে আগত অতিথিরা জানান, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে এটি স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ ইফতার আয়োজন। এতে প্রবাসে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরও দৃঢ় হয়েছে।
অতিথিরা বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান মাহসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের, যারা এই বিশাল আয়োজনটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে বিশেষ দোয়া পরিচালনা করেন রায়হান ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসার পরিচালক মুফতি আব্দুল কাইয়ুম মোল্লা। তিনি দোয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করেন।
দোয়ার সময় পুরো অডিটোরিয়াম যেন এক আবেগময় পরিবেশে ভরে ওঠে। অনেক শিক্ষার্থীর চোখে তখন ছিল দেশের জন্য ভালোবাসা আর ভবিষ্যৎ স্বপ্নের দীপ্তি।
এই মহৎ আয়োজন বাস্তবায়নে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে প্রাণ, পিএসআর গ্লোবাল কনসালটেন্ট, কিচেন কেয়ার অ্যাগ্রো ফুড এবং হারি পাসার। আয়োজকরা জানান, ভবিষ্যতেও প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজন অব্যাহত থাকবে।
মালয়েশিয়ার মাটিতে এই ইফতার মাহফিল যেন শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয় এটি ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের হৃদয়ের মিলনমেলা। কুরআনের তিলাওয়াত, সম্মাননা প্রদান এবং একসাথে ইফতারের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক অনন্য স্মৃতি।
বিশ্বজয়ী কারি আবু রায়হানকে সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা আবারও প্রমাণ করলেন কুরআনের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশের প্রতি গর্ব তাদের হৃদয়ে চিরজাগ্রত।
এমআরএম/জেআইএম