আন্তর্জাতিক

ইরানের খার্গ দ্বীপে আরও হামলার হুমকি ট্রাম্পের

ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে আরও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের সঙ্গে কোনো চুক্তির জন্য তিনি এখনো প্রস্তুত নন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ এখন তৃতীয় সপ্তাহে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় খার্গ দ্বীপের বড় একটি অংশ ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে। শনিবার (১৪ মার্চ) এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও হামলার ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, আমরা হয়তো এটিকে আরও কয়েকবার আঘাত করবো, শুধু মজার জন্য।

ট্রাম্পের এই মন্তব্য তার আগের অবস্থানের তুলনায় অনেক কঠোর বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, খার্গ দ্বীপে কেবল সামরিক স্থাপনাই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। নতুন মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধ বন্ধে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেও বড় ধাক্কা দিয়েছে। এ পর্যন্ত সংঘাতে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক।

মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মিত্র দেশ আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করলেও যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখ্যান করেছে বলে তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে। এদিকে রোববার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছে, তারা ইসরায়েল এবং অঞ্চলে অবস্থিত তিনটি মার্কিন ঘাঁটিতে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে নানা দাবি তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের নেতা নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের মতামতের অধিকার এবং দেশটির পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা। এনবিসি নিউজকে তিনি বলেন, তেহরান যুদ্ধ শেষ করতে একটি চুক্তির জন্য প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে, তবে ‘শর্তগুলো এখনো যথেষ্ট ভালো নয়।’

একই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এমন সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি নিহত হয়ে থাকতে পারেন। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, খামেনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং পরিস্থিতি নিজেই পরিচালনা করছেন।

দীর্ঘায়িত হতে পারে যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট

যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ না থাকায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করার ইরানের সক্ষমতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হিসেবে সামনে এসেছে।

বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালির মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়।

কিছু ইরানি জাহাজ চলাচল করলেও, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক বোমা হামলা শুরু করার পর থেকে বিশ্বের অধিকাংশ জাহাজের জন্য এই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। সেই অভিযানে ইরানের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছে।

প্রথম দিনের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকা উচিত।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণ উপকূলের এই সংকীর্ণ জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেল বাজার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। মার্চ মাসে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ প্রায় ৮ শতাংশ কমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে রবিবার আবার তেল লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে স্থানীয় শিল্পখাতের একটি সূত্র জানিয়েছে। ফুজাইরাহ বিশ্বব্যাপী জাহাজে জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

এদিকে, অপরিশোধিত তেলের দাম এরই মধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠেছে ও আগামী সপ্তাহে আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ বিষয়টি ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির ওপরও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি তাদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

তবে ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন ভোক্তাদের জন্য জ্বালানির দাম দ্রুতই কমে যাবে। একই সঙ্গে তিনি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশকে হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা যায়।

শনিবার (১৪ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, যেসব দেশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পায়, তাদেরই এই পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত, আর আমরা তাদের অনেক সহায়তা করব।

তিনি আরও বলেন, সবকিছু দ্রুত, সহজ এবং ভালোভাবে সম্পন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশের সঙ্গে সমন্বয় করবে।

এদিকে, ফ্রান্স নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছে। ব্রিটেনও মিত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তবে যুদ্ধ চলতে থাকায় উল্লেখিত কোনো দেশই এখনো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়নি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তার ফরাসি সমকক্ষকে বলেছেন, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে যা সংঘাত আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে।

লেবাননের সঙ্গে আলোচনার গুঞ্জন নাকচ ইসরায়েলের

এই অচলাবস্থার মধ্যেই ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু ও অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা এমন ১০টি হামলা প্রতিহত করেছে।

আরাঘচি বলেছেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের কোনো বেসামরিক বা আবাসিক এলাকাকে লক্ষ্যবস্তু করছে না। তিনি আরও বলেন, এমন হামলার দায় নির্ধারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে একটি তদন্ত কমিটি গঠনে ইরান প্রস্তুত।

দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে জ্বালানি স্থাপনা ও আবাসিক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।

ইসরায়েলের সামরিক কৌশল সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ইসরায়েল এখন সেসব সড়ক অবরোধ ও সেতুতে হামলা চালাচ্ছে যেগুলো রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডাররা ব্যবহার করছেন বলে তাদের ধারণা।

ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইসরায়েলের কাছে তথ্য পাঠানোর অভিযোগে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী কয়েক ডজন মানুষকে আটক করেছে।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা’আর যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েল জানিয়েছে যে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক কমে যাচ্ছে—এমন দাবি নাকচ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি লেবাননের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করেছেন। লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েল সম্প্রতি আবার অভিযান শুরু করেছে।

এদিকে, ইরানের কেন্দ্রীয় শহর ইসফাহানে একটি রেফ্রিজারেটর ও হিটার কারখানায় বিমান হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছে বলে শনিবার আধা-সরকারি ফারস সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে।

ইরানের শিল্পাঞ্চলে নিহত শ্রমিকদের জন্য আরও প্রতিশোধমূলক হামলা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি)।

সূত্র: রয়টার্স

এসএএইচ