মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফেরার সুযোগ করে দিতে চালু করা প্রোগ্রামের আওতায় এরইমধ্যে ২ লাখ ৪ হাজার ৫২৩ জন অভিবাসী নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগের অধীনে পরিচালিত এ উদ্যোগটি অবৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন বাংলাদেশি নাগরিকরা।
ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান বুধবার (১৫ এপ্রিল) এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ২০২৫ সালের ১৯ মে থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত মোট ২ লাখ ২৮ হাজার ৯৬১ জন বিদেশি নাগরিক নিবন্ধন করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এরইমধ্যে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে গেছেন। কর্মসূচিটি চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি বলেন, এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার শুধু অবৈধ অভিবাসন সমস্যা নিয়ন্ত্রণেই অগ্রগতি অর্জন করেনি, বরং বিদেশি নাগরিকদের একটি বৈধ ও সম্মানজনক উপায়ে নিজ দেশে ফেরার সুযোগও নিশ্চিত করে।
জাকারিয়া শাবান আরও জানান, এ কর্মসূচির আওতায় সরকার এখন পর্যন্ত মোট ১১ কোটি ৪৫ লাখ ৮৫ হাজার ৮৪০ রিঙ্গিত রাজস্ব সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। এই অর্থ মূলত জরিমানা ও নির্ধারিত ফি থেকে এসেছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, কর্মসূচির শুরুতে অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে ধীরগতির ছিল। অনেক অভিবাসী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন কিংবা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে কর্মসূচির শেষ সময় ঘনিয়ে আসার পর অংশগ্রহণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইমিগ্রেশন অফিসগুলোতে অভিবাসীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তারা স্বেচ্ছায় নিবন্ধন করে দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছেন, বলেন তিনি।
ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সর্বাধিক ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন বাংলাদেশি নাগরিকরা। এছাড়া নেপাল, মিয়ানমার, ভারতসহ আরও বিভিন্ন দেশের নাগরিক এই উদ্যোগের আওতায় দেশে ফিরেছেন।
এদিকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১৯ মে থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির আওতায় ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত প্রায় ৮৩ হাজার ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করা হয়েছে। বর্তমানে অবৈধ প্রবাসীদের আবেদনের ভিত্তিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি ট্রাভেল পারমিট প্রদান করা হচ্ছে।
প্রত্যাবাসন কর্মসূচির মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। জানা গেছে, বিভিন্ন উৎস দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো এই কর্মসূচির মেয়াদ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মালয়েশিয়ার নির্মাণ, কৃষি, উৎপাদন ও সেবা খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে অনেক অভিবাসী নানান জটিলতায় পড়ে বৈধ কাগজপত্র হারিয়ে ফেলেন বা অবৈধ অবস্থায় পরিণত হন। এই প্রেক্ষাপটে এ কর্মসূচি তাদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান হিসেবে কাজ করছে।
জাকারিয়া শাবান বলেন, আমরা কর্মসূচির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছি। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, কর্মসূচির মেয়াদ বাড়ানো হলেও অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী অভিযান অব্যাহত থাকবে। যারা এ সুযোগ গ্রহণ করবে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইমিগ্রেশন বিভাগের উপমহাপরিচালক (অপারেশন) জাফরি এমবক তাহা বলেন, এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো বৈধ কাগজপত্রবিহীন বিদেশি নাগরিকদের একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজ দেশে ফেরার সুযোগ করে দেওয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, এ প্রত্যাবাসন কর্মসূচি কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, বরং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক অভিবাসী দালালচক্রের মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে বা অনিয়মিত পথে এসে সংকটে পড়েন। তাদের জন্য স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রস্থান নিশ্চিত করে।
এছাড়া এই কর্মসূচির মাধ্যমে মালয়েশিয়া সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে যে, তারা অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় কঠোরতার পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও বজায় রাখছে।
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, শুধু প্রত্যাবাসন কর্মসূচি চালু করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ নিয়োগ, দালালচক্র ও মানবপাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
‘পিআরএম ২.০’ কর্মসূচি এর মধ্যে মালয়েশিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় একটি কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। কর্মসূচির মেয়াদ বাড়ানো হলে আরও বেশি সংখ্যক অভিবাসী এই সুযোগ গ্রহণ করে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরবেন—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
এসএইচএস