সাহিত্য

বিশ শতকের শেষভাগের কবিতা: সংকট ও বিবর্তন

জিয়াউদ্দিন লিটন

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে বিংশ শতকের শেষভাগ এক গভীর রূপান্তরের সময়। সময়টি কেবল একটি শতাব্দীর সমাপ্তি নয় বরং মানবসভ্যতার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক চেতনায় এক মৌলিক বাঁক। শীতল যুদ্ধের অবসান, বার্লিন প্রাচীরের পতন, সমাজতান্ত্রিক ব্লকের ভাঙন, উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রগুলোর আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম, প্রযুক্তির বিস্ফোরণ, নারীবাদী আন্দোলনের বিস্তার এবং বৈশ্বিক পরিবেশ সংকট—এই সমগ্র অভিঘাত কবিতাকে দিয়েছে নতুন ভাষা, নতুন কৌশল ও নতুন আত্মসচেতনতা। কবিতা এ সময় ইতিহাসের নীরব সহচর নয় বরং সময়ের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত এক সক্রিয় সাংস্কৃতিক শক্তি।

এই পর্বে কবিতা আর নিছক সৌন্দর্যবোধের শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা হয়ে উঠেছে অস্তিত্বের দলিল, স্মৃতির ভান্ডার, প্রতিবাদের ভাষা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের জীবন্ত নথি। ব্যক্তিমানুষের ভয়, অনিশ্চয়তা ও ক্ষতচিহ্ন কবিতায় বিশ্ব-রাজনীতির প্রতিস্বর হয়ে ওঠে। ফলে বিংশ শতকের শেষভাগের কবিতা বহুমাত্রিক ও বহুস্বরিক অভিজ্ঞতার এক সমন্বিত শিল্পরূপে বিবর্তিত হয়েছে।

শীতল যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া, পারমাণবিক ভীতি, সামরিক শাসন ও রাষ্ট্রীয় দমননীতি এই সময়ের কবিতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। লাতিন আমেরিকায় চিলি, আর্জেন্টিনা ও নিকারাগুয়ার সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে কবিরা কণ্ঠ তোলেন মানবমুক্তির ভাষায়। নেরুদা-উত্তর প্রজন্ম রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, নিখোঁজ মানুষ, গণহত্যা ও নির্বাসনের অভিজ্ঞতাকে কবিতার কেন্দ্রে স্থাপন করে—যেখানে কবিতা হয়ে ওঠে স্মৃতির আদালত ও নৈতিক প্রতিবাদের দলিল।

পূর্ব ইউরোপে উইস্লাভা সিম্বর্সকা ও জেবিগনিয়েভ হার্বার্ট অল্প কথায় গভীর ব্যঙ্গ, লঘু–গম্ভীর স্বরে মানুষের নৈতিক সংকট তুলে ধরেন। ভয়, নীরবতা, রাষ্ট্রের নজরদারি এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষয়—এই সবকিছু তাদের কবিতায় সূক্ষ্ম অথচ তীব্র ভাষ্য পায়। কবি এখানে একইসঙ্গে সাক্ষী, বিবেক ও প্রতিবাদী; রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি মানবিক মূল্যবোধের পক্ষ নেন।

এ সময়ের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—অন্তর্মুখী বিশ্লেষণ, প্রতীক ও ব্যঙ্গের বহুমুখী ব্যবহার, রাজনৈতিক বাস্তবতার উন্মোচন এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বিশ্ব-রাজনীতির পাঠ। কবিতা হয়ে ওঠে নৈতিক অবস্থানের এক শৈল্পিক প্রকাশ, যেখানে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরস্পরকে আলোকিত করে।

আরও পড়ুনমানরো ঘরানা: বিশ্বসাহিত্যে অনন্য দৃষ্টান্ত 

বিংশ শতকের শেষভাগে আফ্রিকা, এশিয়া ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের কবিতায় উপনিবেশোত্তর বাস্তবতা বিশেষ গুরুত্ব পায়। ঔপনিবেশিক ইতিহাস, ভাষা-সংকট, সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও পরিচয়ের অনুসন্ধান কবিতার কেন্দ্রে স্থান নেয়। এডওয়ার্ড সাঈদের সংস্কৃতি এবং সাম্রাজ্যবাদ, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের সাবঅল্টার্ন তত্ত্ব কিংবা ন্‌গুগি ওয়া থিয়ং’ওর মনকে উপনিবেশমুক্ত করা—এসব তাত্ত্বিক চিন্তা কবিতার ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর ছাপ ফেলে।

ফলে কবিতায় দেখা যায়—হাইব্রিড ভাষার ব্যবহার, ভাঙা বাক্যগঠন, দেশজ প্রতীক, মৌখিক পৌরাণিকতার পুনরুজ্জীবন এবং মাতৃভাষাকে রাজনৈতিক প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে দেখার প্রবণতা। ক্যারিবীয় কবি এডওয়ার্ড ব্র্যাথওয়েট ও ডেরেক ওয়ালকট ভাষা ও পরিচয়ের দ্বন্দ্বকে কবিতার কেন্দ্রীয় অভিজ্ঞতায় রূপ দেন। দক্ষিণ এশিয়াতেও পরিচয়কে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়—যেখানে আত্মপরিচয় স্থির নয় বরং ইতিহাস, ক্ষমতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংলাপে নির্মিত।

এ সময়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন হলো আধুনিকতা থেকে উত্তরাধুনিকতার দিকে যাত্রা। উত্তরাধুনিকতা ‘একক সত্য’ বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ ভেঙে বহুস্বরের বাস্তবতাকে প্রতিষ্ঠা করে। ফ্রেডরিক জেমসনের মতে, উত্তরাধুনিকতা হলো দেরি-পুঁজিবাদের সাংস্কৃতিক যুক্তি—যেখানে ফ্রাগমেন্ট, কোলাজ, প্যারোডি ও আন্তঃপাঠ্যতা কবিতাকে নতুন মাত্রা দেয়।

রূপগতভাবে এ সময়ের কবিতায় দেখা যায়—বিভাজন, আন্তঃপাঠ্যতা, পেস্টিচে, উচ্চ ও নিম্ন সংস্কৃতির সীমানা ভাঙা এবং বহুনির্বাচনীয় অর্থ। দেরিদার বিনির্মাণ ধারণার প্রভাবে ভাষা নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে; শব্দ, বাক্য ও নীরবতা হয়ে ওঠে অর্থ-অন্বেষণের ক্ষেত্র। কবিতা তাই আর বন্ধ অর্থের বাহক নয়; এটি পাঠকের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত অর্থ-পরিসর নির্মাণ করে।

ডিজিটাল যুগের সূচনা কবিতার ভাষা ও রূপে নতুন মাত্রা যোগ করে। কম্পিউটার স্ক্রিন, ইন্টারনেট, দ্রুত স্ক্রোলিং ও চিত্রভিত্তিক অভিজ্ঞতা কবিতায় নতুন ছন্দ ও গতি তৈরি করে। দ্রুতগতির বাক্য, ভাঙা ইমেজ, স্ক্রিন-সংস্কৃতির চিহ্ন, হাইপারটেক্সট ও মাল্টিমিডিয়া কবিতা—সব মিলিয়ে কবিতার শরীর কাগজের গণ্ডি ছাড়িয়ে স্ক্রিনভিত্তিক অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। আমেরিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায় ‘ডিজিটাল পয়েট্রি’ বা ‘সাইবার-পয়েট্রি’ আন্দোলনের সূচনা হয়, যেখানে কবিতা দৃশ্য ও শব্দের সমন্বয়ে নতুন শিল্পরূপ লাভ করে।

নারীবাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ এই সময়ের কবিতায় গভীর রূপান্তর আনে। নারীর দেহ নিয়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, যৌন-রাজনীতি, সহিংসতা, বর্ণ ও শ্রেণির অভিজ্ঞতা কবিতাকে নতুন রাজনৈতিক তীব্রতা দেয়। মায়া অ্যাঞ্জেলু, অড্রে লর্ড, রিটা ডোভের কবিতায় দেহ-রাজনীতি ও পরিচয়ের দ্বন্দ্ব নতুন ভাষা পায়। এশীয় নারী কবিদের লেখায় পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধ, অভিবাসন ও নিঃশব্দ ইতিহাস উচ্চকিত হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুনহাসান আজিজুল হকের ছোটগল্প: জীবনের নির্মোহ উচ্চারণ 

নারী-কবিতার বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যায়—ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের পাঠ, দেহকে ভাষার কেন্দ্র করা, ইতিহাসের নীরব অংশকে দৃশ্যমান করা এবং সিস্টারহুড বা নারী-সংহতির চেতনা। এতে কবিতার ভাষা আরও মানবিক, আরও সংবেদনশীল ও বহুকণ্ঠী হয়ে ওঠে।

শতকের শেষভাগে পরিবেশ-ধ্বংস, শিল্পায়নের বিষাক্ত প্রভাব, পারমাণবিক ঝুঁকি, যুদ্ধ ও শরণার্থী সংকট কবিতায় গভীর ছাপ ফেলে। মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত হয়। ইকোপয়েট্রির উত্থানে প্রকৃতি আর নিছক রোমান্টিক অনুষঙ্গ নয়; এটি রাজনৈতিক ও অস্তিত্বগত সত্তা। হারিয়ে যাওয়া নদী, বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রজাতির বিলুপ্তি কবিতায় নৈতিক সতর্কবার্তায় রূপ নেয়। কবি এখানে ভবিষ্যৎ সভ্যতার জন্য এক সতর্ক কণ্ঠস্বর।

এ সময় ভাষা কেবল প্রকাশের মাধ্যম নয় বরং নিজেই হয়ে ওঠে নাটকীয় চরিত্র। অবিন্যস্ত বাক্য, অর্ধবাক্য, শব্দের কোলাজ, নীরবতা ও দ্ব্যর্থতা কবিতার নতুন নান্দনিক রীতি তৈরি করে। হুমায়ুন আজাদের ভাষাতত্ত্ব, দেরিদার অর্থ-বিপথগামিতা ও জেমসনের সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে ভাষা হয়ে ওঠে সৃষ্টির সক্রিয় উপাদান এবং কবিতার ভেতরেই অর্থের রাজনীতি উন্মোচিত হয়।

বিংশ শতকের শেষভাগের কবিতা মূলত সংকট, প্রতিরোধ, পরিচয়, প্রযুক্তি, স্মৃতি ও নান্দনিক অনুসন্ধানের সমন্বিত রূপ। রাজনৈতিক উত্তাল সময়, উপনিবেশোত্তরতা, নারীবাদ, পরিবেশ-চেতনা ও ডিজিটাল বাস্তবতা কবিতাকে দিয়েছে নতুন ভাষা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে এ সময়ের কবিতা শুধু সাহিত্যিক অর্জন নয়; এটি বিশ্ব-মানবের যন্ত্রণা, সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ-চিন্তার এক মহামূল্য দলিল। এ সন্ধিক্ষণই একবিংশ শতকের কবিতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে—বহুস্বর, বহুসংস্কৃতি ও বহুবিচিত্র অভিজ্ঞতার অনিবার্য সংকলন হিসেবে।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কবি, কাব্যালোচক এবং সম্পাদক, শব্দতরী।

এসইউ