দেশজুড়ে

পাহাড়ে সামাজিক উন্নয়নে লড়ে চলেছেন নারী হেডম্যান-কারবারিরা

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত বিচার ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ অতীতের তুলনায় অনেকে বেড়েছে। তবে নেতৃত্বের মর্যাদা রক্ষায় নারীর লড়াই এখনো চলমান। নারীর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এখনো সমানভাবে আসেনি বলে মনে কারেন নারী হেডম্যান ও কারবারিরা। তারা মনে করেন নারী নেতৃত্ব দীর্ঘদিনের সামাজিক ব্যবস্থার সংস্কারের ফল। সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে নারী হেডম্যান ও কারবারিদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং সহযোগিতা প্রয়োজন।

১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি (হিলট্রাক্টস ম্যানুয়্যাল ৩৮নং বিধি) অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সার্কেল চিফ বা রাজার সঙ্গে পরামর্শ করে ডেপুটি কমিশনার (বর্তমানে জেলা প্রশাসক) কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন হেডম্যানরা (মৌজা প্রধান)। নিয়োগের ক্ষেত্রে বংশানুক্রমিক হেডম্যানের উপযুক্ত ছেলেকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে সেই প্রথাগত নিয়ম থেকে বেরিয়ে সম্ভবত ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সালের দিকে রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলার ৬০নং ছয়কুড়ি বিল মৌজায় প্রথম একজন নারী হেডম্যান হওয়ার সুযোগ পান।

‘আমার শাশুড়ি বসুন্ধরা দেওয়ান ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম নারী হেডম্যান।’ খুব গর্বের সঙ্গে একথা বলেন ৬০নং ছয়কুড়ি বিল মৌজার বর্তমান হেডম্যান মনিকা দেওয়ান। তিনি বলেন, ‘আমার শ্বশুর প্রয়াত চুনিলাল দেওয়ান (পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম চিত্রশিল্পী) ছিলেন হেডম্যান। উনি ১৯৫৫ সালের ৮ ডিসেম্বর মারা যান। ওনার মৃত্যুর পর আমার শাশুড়ি ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সালে এই মৌজার হেডম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর ২০০৬ সালে আমার শাশুড়ি মারা গেলে আমার স্বামী সত্য প্রসাদ দেওয়ান ২০০৮ সালে হেডম্যান নিযুক্ত হন। আমার স্বামী মারা যান ২০১৬ সালের অক্টোবরে। এরপর ২০১৭ সালের আগস্টে আমি হেডম্যান হিসেবে নিয়োগ পাই।’

হেডম্যান মনিকা দেওয়ান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের সম্মানীভাতা খুবই কম, যা কাউকে বলা যায় না। সম্মানীটা বাড়ানো খুব দরকার। নারী হিসেবে সমাজের মুরুব্বী হয়ে কাজ করা অনেক কঠিন। তবে সকলের সহযোগিতায় সেই কঠিন লড়াইটা আমরা করে যাচ্ছি। অনেক জটিল ও কঠিন বিষয় মোকাবিলা করে সমস্যার সমাধান করতে হয় আমাদের। নারী হেডম্যান ও কারবারিরা সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।’

মৌজা হেডম্যানরা নিজ মৌজাবাসীর সামাজিক বিচার-সালিশ নিষ্পত্তির দায়িত্ব পালন করেন এবং সার্কেল প্রধান বা রাজার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। হেডম্যানরা প্রজা থেকে জুম খাজনা আদায় করে তা রাজার কাছে দাখিল করেন। হেডম্যান সরকার কর্তৃক সরাসরি বেতনভুক্ত কর্মচারী না হলেও তারা প্রশাসনিক কাজের জন্য বিশেষ ভাতা বা সম্মানী পেয়ে থাকেন।

হেডম্যানের অধীনে কারবারিরা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত প্রশাসনিক ব্যবস্থার তৃণমূল পর্যায়ের পাড়া প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। তাদের প্রধান কাজ হলো গ্রামে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সালিশের মাধ্যমে স্থানীয় বিবাদ নিষ্পত্তি করা এবং হেডম্যানকে ভূমি ও সামাজিক বিষয়ে সহায়তা করা। এছাড়া তারা মৌজা হেডম্যানের নির্দেশে ভূমি কর আদায় ও গ্রামীণ ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে কাজ করেন।

কারবারিদের প্রধান কাজ ও দায়িত্ব সমূহ:

গ্রামের ছোটখাটো বিবাদ ও বিরোধ গ্রাম্য কারবারি পর্যায়ে সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা, মৌজা হেডম্যানের সহকারী হিসেবে কাজ করা এবং প্রশাসনের সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ের সংযোগ স্থাপন করা। মৌজা হেডম্যানের নির্দেশে গ্রামীণ ভূমি সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ এবং ভূমি কর আদায়ে সহায়তা করা। পাহাড়ি এলাকার প্রথা, রীতি-নীতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সমুন্নত রাখা। গ্রামে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনকল্যাণে কাজ করা। নারী কারবারিরাও পার্বত্য চট্টগ্রামের গ্রামে গ্রামে সমানভাবে এই দায়িত্ব পালন করছেন এবং প্রথাগত নেতৃত্বে অবদান রাখছেন।

সিএইচটি নারী হেডম্যান কারবারি নেটওয়ার্কের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ৩নং লংগদু মৌজার কারবারি চম্পা চাকমা বলেন, নারী কার্বারী নিয়োগের বিধান হলো সামাজিকভাবে মনোনীত করা। কিন্তু এখনো বংশানুক্রমের গুরুত্বেই এখানে প্রধান বিবেচনা করা হয়। আমার বাবা কারবারি ছিলেন এবং আমার ভাই অন্য পেশায় থাকায় আমাকেই দায়িত্ব নিতে হয়েছে। সামাজিকভাবে নিয়োগের বিধানে অবশ্যই বাধা রয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে পুরুষ কারবারিকে বাদ দিয়ে নারী কারবারি নিয়োগ সমাজ মানবে না। কারণ সংরক্ষিত পদের বাইরে নারীকে নেতা হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা এখনো সহজ হয়ে ওঠেনি। একজন নারী কারবারি হিসেবে শুধুমাত্র নারী সংক্রান্ত বিষয়ে নারী কারবারির গুরুত্ব পায়, অন্য ক্ষেত্রে তেমন কোনো গুরুত্ব থাকে না।

নিজের অভিজ্ঞতার গল্প বলতে গিয়ে সিএইচটি নারী হেডম্যান কারবারি নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক নারী কারবারি শান্তনা চাকমা বলেন, ২০২৩ সালের এটি ঘটনা আজও আমার মনে দাগ কেটে আছে। দশম শ্রেণি পড়ুয়া দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে যা এক পর্যায়ে শারীরিক সম্পর্কে গড়ায়। তখন বিষয়টি সামাজিকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের কথা শোনার চাইতে তাদের বিয়ে দেওয়ার পক্ষেই সবাই চেষ্টা করছিলেন। যা আমার কাছে ভালো লাগেনি। আমি তাদের বাধা দিই এবং শিক্ষার্থী দুজনের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে কথা বলে তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করি। একপর্যায়ে তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী দুজনকে বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা করি। এখন তারা পড়ালেখায় নিয়মিত হয়েছে।

কারবারি শান্তনা খীসা আরও বলেন, অভিজ্ঞতা একটি বড় বাধা এখানে। যেখানে পুরুষ হেডম্যান ও কারবারিরা পারিবারিক সূত্রে সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ পান। সেখানে নারীদেরকে দূরে রাখা হয়, ফলে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকে যায়। আমরা যারা দায়িত্ব পালন করছি তারা সবাই কাজ করতে করতে শেখার চেষ্টা করছি। কাজ করতে গিয়ে যখন নানা জটিল সমস্যার সম্মুখীন হই, তখন অভিজ্ঞদের থেকে পরামর্শ নিতে হয়। তবে এখানে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সহযোগিতার অভাব রয়েছে। যেহেতু দায়িত্বটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী, সমাজ ও পরিবার থেকে সহযোগিতার হাত বাড়ালে নারীরাও এখানে মর্যাদার সঙ্গে কাজ করে সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে।

প্রান্তিক নারীদের অধিকার আদায় ও সচেতনতা সৃষ্টিতে নারী হেডম্যান ও কার্বারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিশেষ করে আদিবাসী নারীরা সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত। সে বিষয়ে জনমত গড়ে তোলা নারী হেডম্যান হিসেবে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে মনে করেন সিএইচটি নারী হেডম্যান কারবারি নেটওয়ার্কের সভাপতি ও খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের সদস্য জয়া ত্রিপুরা।

তিনি বলেন, সালিশ বিচারে অনেক সময় আমাদের সিদ্ধান্তকে স্থানীয় কারবারি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সহজে মেনে নিতে চায় না। সেসময় আমরা যুক্তি দিয়ে আইনের ন্যায্যতার কথা বলে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকি। এটা নারী নেতৃত্বের একটি বড় অর্জন। নারীদের সচেতন করতে হলে জেলা উপজেলার বাইরেও প্রান্তিক পর্যায়ে সরকারের উদ্যোগ নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন।

তবে নারী হিসেবে হেডম্যান নিয়োগ পাওয়া জয়া ত্রিপুরার জন্য মোটেই সহজ ছিল না। পরিবার থেকে আসা নানা বাধার দেওয়াল টপকে এখানে আসতে হয়েছে তাকে। তিনি বলেন, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী থেকে আমিই একমাত্র নারী হেডম্যান। আমার স্বামীর অসুস্থতার কারণে ২০০৯ সালে আমি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার ১৮৫নং অযোদ্ধা মৌজায় হেডম্যানের দায়িত্ব নিয়েছি। এখানে আমার স্বামী আমাকে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন, কিন্তু আমার স্বামীর ভাইয়েরা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে আমার শ্বশুরবাড়ির বাকি সবার সমর্থন পেয়েছি। মং সার্কেলের প্রধানের কাছে লিখিত অনাপত্তি দেওয়ার পর জেলা প্রশাসক আমাকে চূড়ান্ত নিয়োগ প্রদান করেন।

তবে নারী হিসেবে এমন গুরুদায়িত্ব সামাল দিলেও আক্ষেপ রয়েছে সম্মানী ভাতা নিয়ে। সরকারিভাবে হেডম্যান হিসেবে আমাদের যে সম্মানী দেওয়া হয় তা খুবই নগণ্য। বর্তমান সময়ের বিবেচনায় এই ভাতা ১০ হাজার করার দাবি করেন নারী নেত্রী জয়া ত্রিপুরা।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, মিডিয়ার মাধ্যমে আমি বর্তমান সরকারের কাছে হেডম্যান ও কারবারিদের সম্মানীভাতা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিতে অনুরোধ করছি। সরকার যাতে আমাদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।

একজন নারীর জীবনে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা থাকবেই, সেসব উত্তরণ করেই পথ চলতে হবে। এজন্য নারীকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনে অবদান রাখতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গমতা পেরিয়ে শতাধিক নারী হেডম্যান ও পাঁচ শতাধিক নারী কারবারি নেতৃত্বের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। সেই আলোয় আলোকিত হয়ে এখানকার নারীরা সচেতন হবে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের গুণগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এমনটাই প্রত্যাশা পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দাদের।

এফএ/জেআইএম