* ফ্লাইওভারের ওপরেই বাস কাউন্টার* জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল যাত্রীদের
গাজীপুরের টঙ্গী ও ঢাকার উত্তরার সংযোগস্থলে অবস্থিত আব্দুল্লাহপুর ফ্লাইওভার এখন কার্যত অঘোষিত বাসস্টপে রূপ নিয়েছে। যানজট নিরসন ও দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করতে নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইওভারের ওপরেই গড়ে উঠেছে দূরপাল্লার বাসের অস্থায়ী কাউন্টার, টঙ দোকান ও হকারদের সারি। নির্ধারিত বাসস্টপ উপেক্ষা করে ফ্লাইওভারের ওপরেই যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে নিয়মিতভাবে।
ফলে ব্যস্ত এই সড়কে প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে যাত্রীদের। ফুটওভার ব্রিজ বা নিরাপদ পারাপারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ঢালু পথে হেঁটে নামছেন বা দ্রুতগতির যানবাহনের ফাঁক গলে পার হচ্ছেন। এতে যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই এমন অনিয়ম চললেও কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
ফ্লাইওভারের ওপরেই যাত্রী ওঠানামাসরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আইচি গেট, উত্তরা ৮ নম্বর সেক্টরের শেষগলি, ৯ নম্বর সেক্টর, টঙ্গীবাজার ও পলওয়েল কোটবাড়ী এলাকার যাত্রীদের অনেক সময় সরাসরি আব্দুল্লাহপুর ফ্লাইওভারের ওপরেই নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রাজধানী থেকে ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলকারী দূরপাল্লার বাসগুলোও একইভাবে ফ্লাইওভারের ওপর যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে।
যদিও ফ্লাইওভারের ঢালু অংশে নির্ধারিত বাসস্টপ রয়েছে, অধিকাংশ বাস সেখানে থামছে না। চালকদের সময় বাঁচানো এবং যাত্রীদের তাড়াহুড়োর কারণে এই অনিয়ম ক্রমে স্বাভাবিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। ফলে যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়ে দ্রুতগতির যানবাহনের পাশ দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে।
অন্ধকার সিঁড়ি, অচল লিফটফ্লাইওভারের মাঝ বরাবর থাকা দুটি সিঁড়ির একটি পুরোপুরি বন্ধ। ব্যবহারযোগ্য সিঁড়িতেও দিনের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। সেখানে প্রায়ই ভবঘুরে ও ছিন্নমূল মানুষের অবস্থান দেখা যায়। একটি লিফট স্থাপন করা হলেও তা দীর্ঘদিন ধরে অচল। এর চারপাশ অপরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধময় পরিবেশে পরিণত হয়েছে।
ফলে অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে ঢালু ফ্লাইওভার দিয়ে হেঁটে নামছেন। দ্রুতগতির যানবাহনের মাঝ দিয়ে এভাবে চলাচল যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে, এমন আশঙ্কা স্থানীয়দের। তাদের দাবি, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, সিঁড়ি ও লিফট সচল করা এবং নিয়মিত আলোর ব্যবস্থা করা হলে ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।
সন্ধ্যার পর ঝুঁকি আরও বাড়েস্থানীয় বাসিন্দা কামাল জানান, দিনের বেলায় মানুষের উপস্থিতি থাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা তুলনামূলক কম ঘটে। তবে সন্ধ্যা নামার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। অনেক সময় কান্নার শব্দ শোনা যায়, কারও ব্যাগ কেটে নেওয়া হয় বা মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
কামালের মতে, অন্ধকার সিঁড়ি, অচল লিফট এবং ভবঘুরেদের আড্ডাই এসব অপরাধের সুযোগ তৈরি করছে।
আইচি গেট এলাকার আরেক বাসিন্দা সাইয়েদুল ইসলাম বলেন, আব্দুল্লাহপুর ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। অন্তত সিঁড়িতে পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি কমবে এবং যাত্রীরা স্বস্তিতে চলাচল করতে পারবেন।
অস্থায়ী কাউন্টার ও হকারদের দখলফ্লাইওভারের ওপর ও নিচে টঙ দোকানের আদলে গড়ে উঠেছে একাধিক বাস কাউন্টার ও হকারের স্টল। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অবৈধ স্থাপনা ফ্লাইওভারের স্বাভাবিক ব্যবহারে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে এবং যাত্রী চলাচলে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
শরিফ উদ্দিন নামের একজন বলেন, ফ্লাইওভারের দুই পাশে যাত্রী নামানো যায় কিন্তু বাসগুলো ফ্লাইওভারেই নামাবে। এখানে একটা সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, স্থাপনা করা হয়েছে। এতে সংকট তৈরি হচ্ছে, গাড়ির গতি কমছে আবার দুর্ঘটনার শঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
দূরপাল্লার এক বাস কাউন্টারের কর্মী হাবিব বলেন, দিনের বেলায় এখানে বাস থামা ও লোকসমাগম থাকায় ছিনতাই তুলনামূলক কম হয়। তবে সন্ধ্যার পর লোকজন কমে গেলে ঝুঁকি বাড়ে।
তার মতে, নিয়মিত পুলিশ টহল ও অবৈধ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
প্রশাসনের নজরদারি প্রয়োজননগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, আব্দুল্লাহপুর ফ্লাইওভার কখনোই যাত্রী ওঠানামার স্থান হতে পারে না। ফ্লাইওভারে বাসস্টপ বা কাউন্টার স্থাপনের ফলে সড়ক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে। অবৈধ কাউন্টার ও হকার উচ্ছেদ, সিঁড়ি ও লিফট সচল করা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পুলিশ টহল নিশ্চিত করা জরুরি।
যানজট নিরসনের জন্য নির্মিত এই অবকাঠামো যদি উল্টো ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনাকেই নির্দেশ করে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটি যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে, এমন আশঙ্কা স্থানীয় বাসিন্দাদের। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি উত্তরা) আনোয়ার সাঈদ জানিয়েছেন, যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে ট্রাফিক বিভাগ। আন্তজেলা বাসগুলো যাত্রী ওঠানামার জন্য আব্দুল্লাহপুর ফ্লাইওভারের ওপর থামে। সেখানে একাধিক কাউন্টার গড়ে ওঠায় স্থানটি কার্যত একটি অস্থায়ী টার্মিনালে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বাসগুলো থামানোর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়। এ কারণে ট্রাফিক পুলিশ চেষ্টা করছে যেন বাসগুলো দুই লেনে না দাঁড়িয়ে একটি লেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এতে যানজট তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
বৃহস্পতিবার ও বিভিন্ন ছুটির দিনে যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় গাড়ির গতি কিছুটা ধীর হয়ে পড়ে বলেও জানান তিনি। এরপরও যারা আইন অমান্য করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই মামলা দেওয়া হচ্ছে।
ডিসি উত্তরা আরও বলেন, ফ্লাইওভারে ফুটওভারব্রিজ বা নির্ধারিত চলাচলের পথ না থাকলেও সুশৃঙ্খলভাবে যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করতে পুলিশ নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। এক লাইনে বাস রেখে যাত্রী ওঠানামা করানোর মাধ্যমে যানজট কমিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
ইএআর/এমএমএআর