লাইফস্টাইল

কিডনি ভালো আছে কি না বুঝবেন কীভাবে?

মানুষের দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি অঙ্গ হচ্ছে কিডনি। এর কাজ শরীরের বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে বের করা, শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় কিডনির সমস্যা দীর্ঘদিন নীরবে শরীরে বাসা বাঁধে। শুরুতে তেমন কোনো তীব্র উপসর্গ না থাকায় বেশিরভাগ মানুষ বিষয়টি বুঝতেই পারেন না। ফলে অনেক সময় রোগটি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছানোর পর ধরা পড়ে।

আপনার কিডনি ভালো আছে কি না তা কীভাবে বুঝতে পারবেন সে বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজির আবাসিক চিকিৎসক ডা. মীর রাশেদুল হাসান। তার মতে, কিছু প্রাথমিক লক্ষণ আছে যেগুলো অবহেলা না করে গুরুত্ব দিলে কিডনির সমস্যা আগেই শনাক্ত করা সম্ভব।

ছবি: ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজির আবাসিক চিকিৎসক ডা. মীর রাশেদুল হাসান

প্রস্রাবে পরিবর্তন দেখা দেওয়া

কিডনি ভালো আছে কি না বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো প্রস্রাবের দিকে খেয়াল রাখা। প্রস্রাবের রঙ, পরিমাণ বা স্বাভাবিক অভ্যাসে কোনো পরিবর্তন হলে সেটি কিডনির সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। যেমন- প্রস্রাবের পরিমাণ হঠাৎ কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি, প্রস্রাবে ফেনা দেখা যাওয়া, প্রস্রাবের রঙ গাঢ় বা লালচে হওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

আরও পড়ুন:  অসচেতন জীবনযাপনেই বাড়ছে কিডনি রোগের ঝুঁকি ঈদ প্রস্তুতিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চিকিৎসকের বিশেষ পরামর্শ শরীর ফুলে যাওয়া

কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও লবণ বের হতে পারে না। ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশে পানি জমে ফুলে যেতে পারে। বিশেষ করে পা বা গোড়ালি ফুলে যাওয়া, চোখের নিচে ফোলা ভাব, মুখমণ্ডলে অস্বাভাবিক ফোলা। এই ধরনের উপসর্গ দেখা গেলে সেটিও কিডনির সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা

কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীরে বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ জমতে থাকে। এর ফলে অনেক সময় মানুষ অকারণ ক্লান্তি অনুভব করেন। সাধারণত যেসব লক্ষণ দেখা যেতে পারে- সারাদিন ক্লান্ত লাগা, শক্তি কমে যাওয়া, কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া। এই উপসর্গগুলো দীর্ঘদিন থাকলে অবশ্যই পরীক্ষা করানো উচিত।

ক্ষুধামন্দা ও বমিভাব

কিডনির সমস্যা বাড়লে শরীরে জমে থাকা বর্জ্য পদার্থের প্রভাব পড়তে পারে পরিপাকতন্ত্রে। তখন অনেকের খাবারের প্রতি অনীহা তৈরি হয়। এর সঙ্গে থাকতে পারে বমিভাব, মুখে অস্বাভাবিক তিক্ত স্বাদ, খাবার খেলেই অস্বস্তি। এসব লক্ষণও কিডনির সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।

ত্বক শুষ্ক ও চুলকানি

কিডনি শরীরের খনিজ ও পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। কিডনির সমস্যা হলে অনেক সময় ত্বক শুষ্ক হয়ে যায় এবং চুলকানি দেখা দিতে পারে। যদি কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই ত্বকে দীর্ঘদিন চুলকানি থাকে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির সম্পর্ক

কিডনি ও উচ্চ রক্তচাপের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার কিডনির সমস্যা থাকলেও রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। তাই যাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদের নিয়মিত কিডনির পরীক্ষা করানো জরুরি।

কারা বেশি ঝুঁকিতে

ডা. মীর রাশেদুল হাসানের মতে, কিছু মানুষ কিডনি রোগের ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। যেমন- ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপে ভোগা মানুষ, যাদের পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস আছে, অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধ নিয়মিত সেবন করেন যারা। এই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের বছরে অন্তত একবার কিডনির পরীক্ষা করা উচিত।

কিডনি ভালো রাখতে কী করবেন? পর্যাপ্ত পানি পান করুন। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীরের বর্জ্য পদার্থ সহজে বের হয়ে যায়। লবণ কম খান। অতিরিক্ত লবণ কিডনির ওপর চাপ বাড়ায়। নিয়মিত ব্যায়াম করুন। সুস্থ শরীর কিডনিকে ভালো রাখতে সহায়তা করে। রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন। এই দুটি রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকলে কিডনি ক্ষতির ঝুঁকি কমে। অযথা ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকুন। বিশেষ করে ব্যথানাশক ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দীর্ঘদিন খেলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে। নিয়মিত পরীক্ষা কেন জরুরি

কিডনি রোগ অনেক সময় নীরবে বাড়তে থাকে। তাই উপসর্গ না থাকলেও ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। রক্ত ও প্রস্রাবের সাধারণ কিছু পরীক্ষার মাধ্যমেই কিডনির অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা এবং সময়মতো পরীক্ষা করানোর মাধ্যমেই কিডনি রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। নিজের শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। কারণ শরীর অনেক সময় আগেই সংকেত দেয়, শুধু সেই সংকেতগুলো বুঝে নেওয়াই হলো সচেতনতার প্রথম ধাপ।

জেএস/