খেলাধুলা

আবারও পাকিস্তানকে হারিয়েই শুরু হবে নতুন যাত্রা?

খুব বেশি না হলেও অতীতে কমবেশি সাফল্য ছিল বাংলাদেশের। ১৯৯৯ সালে প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলতে গিয়ে পাকিস্তানকে হারিয়েই হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর নিজ মাটিতে ভারতকে হারানো এবং ন্যাটওয়েস্ট ট্রফিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর রেকর্ডও আছে।

২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো তো ইতিহাস হয়েই আছে। চার বছর পর ২০১১ সালে দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপেও আছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অবিস্মরণীয় জয়ের সুখস্মৃতি।

এর বাইরে বড় ও প্রতিষ্ঠিত দলের মধ্যে নিউজিল্যান্ডকে ঘরের মাঠে নাকানি-চুবানি খাওয়ানোর রেকর্ডও আছে বাংলাদেশের, দুইবার। প্রথমটি ২০১০ সালের অক্টোবরে। পাঁচ ম্যাচের সেই সিরিজে ড্যানিয়েল ভেটোরির দলকে ৪-০ ব্যবধানে ‘হোয়াইটওয়াশ’ করে বাংলাদেশ (একটি ম্যাচ বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হয়)।

এর তিন বছর পর, ২০১৩ সালের নভেম্বরে, ঢাকায় আবারও কিউইদের ৩-০ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজে হারায় বাংলাদেশ। উল্লেখ্য, জিম্বাবুয়ে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের রেকর্ড থাকলেও শক্তিশালী টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওই দুটি সিরিজই ছিল বাংলাদেশের জন্য বিশেষ। ২০০৯ সালে ক্যারিবিয়দের তাদের দেশেই টেস্ট ও ওয়ানডে দুই সিরিজেই বাংলাওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ। সেটি ছিল উইন্ডিজদের দ্বিতীয় সারির দল। তাই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুই সিরিজের সফলতা অবস্থান করে অনন্য উচ্চতায়।

তবে একটি কথা ধ্রুবতারার মতো সত্য—ওয়ানডে ফরম্যাটে দল হিসেবে বাংলাদেশ নিজেদের শক্তি দেখাতে শুরু করেছিল পাকিস্তানের বিপক্ষেই।

২০১৫ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানকে তিন ম্যাচের সিরিজে ‘বাংলাওয়াশ’ দিয়ে নতুন এক যুগের সূচনা করেছিল টাইগাররা। টাইগারদের শৌর্য-বীর্যের কাছে আজহার আলির পাকিস্তান রীতিমতো অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল।

এরপর ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকেও ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হারিয়ে নিজেদের সাহস ও ভালো খেলার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়ায় বাংলাদেশ। ভালো খেলার সেই ধারাবাহিকতা ছিল ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত।

সেই আসরে অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান ব্যাট ও বল হাতে জ্বলে উঠে দেখিয়ে দেন কেন তিনি বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন। ওই বিশ্বকাপেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী দুটি দলকে হারায় বাংলাদেশ।

এরপর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। মাশরাফি বিন মুর্তজা দল থেকে সরে যান। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তামিম ইকবাল ওয়ানডে খেলছেন না। দীর্ঘ সময় সাকিবও দেশে না থাকায় জাতীয় দলে নিয়মিত খেলতে পারেননি। ফলে দলের শক্তি অনেকটাই কমে আসে।

টিম বাংলাদেশ আবারও কিছুটা ব্যক্তি নির্ভর হয়ে উঠতে শুরু করে। এরপর মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ওয়ানডে থেকে সরে দাঁড়ালে ‘পঞ্চপান্ডব’-শূন্য বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের সেই ঔজ্জ্বল্য দিন দিন কমতে থাকে।

লিটন দাস, নাজমুল হোসেন শান্ত, সৌম্য সরকার, তানজিদ হাসান তামিম, সাইফ হাসান, তাওহিদ হৃদয়, শামীম পাটোয়ারী ও জাকের আলী অনিকরা ঠিক পূর্বসূরিদের মতো ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দিতে পারেননি। কেউ কেউ ভালো খেললেও দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার সেই দৃঢ়তা বা ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি।

ফলে দলের পারফরম্যান্সে ভাটা পড়ে। ২০২৫ সালে আফগানিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কার কাছে ওয়ানডে সিরিজ হারতে হয় বাংলাদেশকে। তখন মনে হচ্ছিল ওয়ানডেতে শক্ত দল হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর দিন বুঝি শেষ হয়ে যাচ্ছে।

তবে সবশেষ গত বছরের অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজে আবার জয়ের দেখা পায় বাংলাদেশ। যদিও সিরিজটি হয়েছিল শেরে বাংলার চিরচেনা স্লো ও লো পিচে।

শেষ ম্যাচটি হয়েছিল তুলনামূলক ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে। দুই ওপেনার সৌম্য সরকার (৯১) ও সাইফ হাসান (৮২) অনিন্দ্য সুন্দর ব্যাটিংয়ে প্রথম উইকেটে মাত্র ২৫.২ ওভারে ১৭৬ রান তুলে সিরিজ জয়ের ভিত গড়ে দেন।

পুরো সিরিজে ১২ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি প্রথম দুই ম্যাচে আক্রমণাত্মক ও দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে সিরিজ জয়ের নায়ক হন রিশাদ হোসেন। তিনি হন ম্যান অব দ্য সিরিজ।

চার মাস পর ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে আবার ওয়ানডে সিরিজ। সামনে ওয়ানডে বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব এড়াতে প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। জয়ও খুব দরকার।

তবে এবার অবাক করা বিষয়। বাংলাদেশ আগের মতো স্লো ও লো পিচে খেলেনি। গত ১১ মার্চ হোম অব ক্রিকেটে দেখা মিলেছে একেবারে স্পোর্টিং পিচের। আর তাতেই যেন নতুন উদ্যমে উজ্জীবিত বাংলাদেশ দল।

নতুন দিনের শুরুর নায়ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুতগতির তরুণ পেসার নাহিদ রানা।

লম্বা ও ছিপছিপে গড়নের নাহিদ রানা দেখিয়ে দিয়েছেন, একজন ফাস্ট বোলার একাই একটি দলের ব্যাটিং মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারেন। বোলিং করেছেন ১৪৫ কিলোমিটার গড় গতিতে। থ্রি-কোয়ার্টার লেন্থ থেকে বল তুলে আনার ক্ষমতায় রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়ে পাকিস্তানি ব্যাটাররা।

তার সেই দুর্দান্ত বোলিং তোপেই উড়ে যায় শাহিন শাহ আফ্রিদির পাকিস্তান। ম্যাচ শেষে পাকিস্তানের নিউজিল্যান্ড বংশোদ্ভূত কোচ মাইক হেসন অকপটে স্বীকার করেন, ‘আমরা নাহিদ রানার কাছেই হেরে গেছি।‘’

নাহিদের সঙ্গে যদি তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান সমানভাবে সমর্থন দিতে পারতেন, তাহলে পাকিস্তানকে হয়তো ১০০ রানের নিচেই অলআউট করা যেত।

তবুও সাহিবজাদা ফারহান, মাজ সাদাকাত, শামিল হোসেন, সালমান আগা ও হাসান তালাতের পাকিস্তান দল শেষ পর্যন্ত ১১৪ রানেই থেমে যায়।

এরপর টি-টোয়েন্টি মেজাজে ব্যাটিং করে মাত্র ১৫ ওভারেই জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ।

নাহিদ রানা ও অধিনায়ক মেহেদি হাসান মিরাজের দুর্দান্ত বোলিংয়ের পর দুই বাঁহাতি ব্যাটার তানজিদ তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্তর আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে উড়ন্ত সূচনা পায় বাংলাদেশ।

এই দারুণ জয়েই আশাবাদী হয়ে উঠেছেন টাইগার সমর্থকেরা। তাদের আশা, আবারও দেখা যাবে ২০১৫ সালের পুনরাবৃত্তি।

মিরাজের নেতৃত্বে বাংলাদেশ কি তা পারবে? ওয়ানডে র‍্যাংকিংয়ে এখন ১০ নম্বরে থাকা বাংলাদেশ কি ১১ বছর আগের মতো আবারও পাকিস্তানকে হারিয়ে নিজেদের সাহস, উদ্যম ও শক্তি ফিরে পাবে?

সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।

এআরবি/আইএন