দেশজুড়ে

শাহজাদপুরে ঈদের আমেজ, প্রতি হাটে বিক্রি হয় ৭০০ কোটি টাকার কাপড়

বিশাল আড়তের ভেতর ছোট ছোট দোকান, হাজার হাজার পাইকার-খদ্দেরের আনাগোনা, দরদামের হাঁকডাক আর চারদিকে কাপড়ের গাঁটের ছড়াছড়ি। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাছাড়ি বাড়ির গা ঘেঁষে বসা কাপড়ের হাটের চিত্র এটি।

সপ্তাহের রবি ও বুধবার বসে এ হাট। যা শনি ও মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয়। এদিন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সীমান্তের ওপার থেকেও আসেন ক্রেতারা। পাইকার-খদ্দেরের হাঁকডাক আর কোলাহলে তিল ধারণের জায়গা থাকে না এই কাপড়ের হাটে।

স্বাভাবিক সময়ে প্রতি হাটে ২০০-২৫০ কোটি টাকার লেনদেন হলেও ঈদের সময় সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫০-৭০০ কোটি টাকায়। লেনদেনের বিশাল এই অঙ্কের কারণেই হাটটিকে বলা হয় দেশের ‘সবচেয়ে বড়’ কাপড়ের হাট। এমন মোটা অঙ্কের বেচাকেনার হিসাব সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে।

সরেজমিন দেখা গেছে, হাটের পাশের সড়কে রাখা সারি সারি ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানে লোড করা হচ্ছে কাপড়ের বান্ডেল (গাঁট)। রিকশা, ভ্যান ও শ্রমিকরা মাথায় কাপড়ের গাঁট নিয়ে আসা-যাওয়ায় ব্যস্ত। এতে বাজারের ভেতরের সকল সরু গলিপথে যেন চলাচল করাই দায়। রোজার ঈদকে ঘিরে বেড়েছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যস্ততা। কেনাকাটা শেষ হলে বাজারের শ্রমিকরা কাপড়ের গাঁট তুলে দিচ্ছেন সড়কে রাখা ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনে। এসব ট্রাকবোঝাই কাপড় যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

ফিরোজ টেক্সটাইলের মালিক হাজী ফিরোজ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ইন্ডিয়ান পাইকাররাই আমার দোকানের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। কিছু পাকিস্তানের খরিদ্দারও আসে। দেশের মধ্যে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বেশি আসে। একটা সময় ছিল যখন লেনদেন হতো হাতে। এখন টাকার অঙ্ক লাখ বা কোটি যাই হোক সব ব্যাংকেই হয়।

দীপক সাহা নামের একজন ভারতীয় পাইকার জানান, তিনি প্রায় দু’মাস পরপর পাইকারি দরে শাড়ি কিনতে শাহজাদপুর হাটে আসেন। তার পশ্চিমবঙ্গে একটি শাড়ি ও লুঙ্গির দোকান রয়েছে।

তিনি বলেন, তাঁতের শাড়ি ও লুঙ্গি ভারতেও উৎপাদিত হয়। কিন্তু দাম বেশি। আর বাংলাদেশে অনেক কম দামেই পাওয়া যায়। তাই এদিকে আসি আমরা।

চট্টগ্রাম থেকে আসা মোতালেব সেখ নামে একজন পাইকার জাগো নিউজকে বলেন, চট্টগ্রামে সিরাজগঞ্জের শাড়ি-লুঙ্গির ব্যাপক চাহিদা। এখান থেকে কাপড় নিয়ে আমরা নিজেদের দোকানের ব্র্যান্ডের মার্কা লাগিয়ে শো-রুমে খুচরা দরে বিক্রি করি। এ হাটের পাইকাররা বিশ্বস্ত খরিদ্দার পেলে কোটি টাকার উপরেও বাকি দেয়।

পাইকার বাবলু সেখ জাগো নিউজকে বলেন, পাইকারি বাজারে আমরা শাড়ি-লুঙ্গি বিক্রি করি জোড়া, পেটি, থান হিসেবে। কেউ শাড়ির দাম জিজ্ঞাসা করলে এক জোড়া শাড়ির দাম বলা হয়, আর লুঙ্গির ক্ষেত্রে এক থান, মানে চারটা লুঙ্গির দাম বলা হয়। বাইরে থেকে কেউ এসে শাড়ি-লুঙ্গির দাম জিজ্ঞাসা করলে প্রায়ই কনফিউজড হয়। থান, জোড়া ছাড়াও আরেকটি একক হিসাব করে তাঁতের পণ্য বিক্রি করা হয়। সেটি হল পেটি। তবে শাড়ি ও লুঙ্গির পেটির হিসাব আলাদা। ৬টি শাড়িতে এক পেটি ও ১০টি লুঙ্গিতে এক পেটি হিসাব করা হয়। পাইকারি বেচাকেনার ক্ষেত্রে পেটি একক হিসেবে বিবেচিত হয়। যত বড় এককে পণ্য কেনা যায় দাম তত সাশ্রয় হয়।

লুঙ্গি ব্যবসায়ী আব্দুল হালিম জাগো নিউজকে বলেন, এ অঞ্চলের তাঁতের কাপড়ের সুনাম দেশজুড়ে। ঈদকে ঘিরে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এই হাটে কেনাবেচা বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। শাড়ি, লুঙ্গি, থান কাপড় ও থ্রিপিসসহ সকল প্রকার দেশি কাপড় পাইকারি দরে কিনতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই হাটে ভিড় করছেন পাইকাররা। তবে এবছর সকল প্রকার কাপড়ের দাম কিছুটা বেড়েছে।

ঐতিহ্যবাহী এই হাটের বদৌলতে স্থানীয় পরিবহন ও পর্যটন শিল্পেরও উন্নতি ঘটেছে। হাটের চারদিক দিয়ে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় আবাসিক-অনাবাসিক হোটেল ও খাবারের দোকান। দোকানগুলোতে স্বল্পমূল্যে ভালো মানের খাবার পাওয়া যায়।

কথা হয় হাটের ইজারাদার নাদিম আলীর সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়াসহ ন্যায্য দামে চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের দেশি কাপড় এই হাটে পাওয়া যায়। এবার ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি হাটে ৬৫০-৭০০ কোটি টাকার কাপড় বিক্রি হচ্ছে।

এফএ/জেআইএম