বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সরাসরি প্রভাব পড়ে খাদ্যপণ্যের দামেও। কারণ কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহন—খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি ধাপেই তেল ও গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে।
ক্ষেতের ফসল উৎপাদনের শুরুতেই জ্বালানির প্রভাব দেখা যায়। কৃষিতে ব্যবহৃত অনেক সারই প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তৈরি হয়। পাশাপাশি সেচ ব্যবস্থা চালানো এবং ট্র্যাক্টরসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র পরিচালনার জন্যও জ্বালানি প্রয়োজন হয়। ফলে তেলের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনের খরচও বাড়ে।
ফসল সংগ্রহের পর সংরক্ষণেও জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগারে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন, যা অনেক ক্ষেত্রে গ্যাস বা ডিজেলভিত্তিক উৎস থেকে আসে। একই সঙ্গে, সংরক্ষণাগারের নিরোধক বা ইনসুলেশন তৈরিতেও পেট্রোলিয়ামজাত উপাদান ব্যবহৃত হয়।
আরও পড়ুন>>তেল-গ্যাস থেকে জ্বালানি ছাড়াও যেসব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি হয়ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ৮৫ দেশে বেড়েছে তেলের দাম, নেই বাংলাদেশ
খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিংয়েও তেলের প্রভাব রয়েছে। বাজারে ব্যবহৃত অধিকাংশ প্লাস্টিক প্যাকেজিং তৈরি হয় পেট্রোকেমিক্যালের উপজাত পলিথিন থেকে। ফলে তেলের দাম বাড়লে প্যাকেজিংয়ের খরচও বেড়ে যায়।
সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। ক্ষেত থেকে গুদাম, গুদাম থেকে বাজার এবং বাজার থেকে সুপারমার্কেট—প্রতিটি ধাপে খাদ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক বা জাহাজে জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। তেলের দাম বাড়লে এই পরিবহন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত খরচ ভোক্তাদের ওপরই চাপানো হয়।
অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যাকউইলিয়ামস বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রাণশক্তি হচ্ছে পরিবহন। পণ্যকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত সরবরাহ শৃঙ্খল ও লজিস্টিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে, আর এই ব্যবস্থার শক্তি আসে জ্বালানি থেকে।
আরও পড়ুন>>যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্বের তেলবাজারে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড়’ সংকটরেকর্ড উচ্চতা থেকে ‘মাইনাস’ দাম: দুই দশকে তেলের বাজারে নাটকীয় অস্থিরতাট্রাম্প কি পারবেন তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি আটকাতে?
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দামে বড় ধরনের ধাক্কা লাগলে তা অনেক সময় ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর ঝুঁকি তৈরি করে—যেখানে একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়ে, অন্যদিকে বেকারত্বও বৃদ্ধি পায়। ইতিহাসে ১৯৭৩, ১৯৭৮ এবং ২০০৮ সালের তেল সংকটের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় মন্দা দেখা দেওয়ার উদাহরণ রয়েছে।
বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এর প্রভাব বেশি তীব্র হতে পারে। কারণ এসব দেশে মানুষ তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় করে এবং অনেক দেশই শস্য ও সার আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেলের দাম বাড়লে দ্রুত খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়া কিংবা খাদ্য সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
সূত্র: আল-জাজিরাকেএএ/